ভ্রমণের এই পর্যায় কিছুটা অন্যরকম৷ এই যাত্রা একটু বিশেষ প্রকৃতির৷ এতে আছে রোমাঞ্চকর কিছু মুহুর্ত৷ ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস৷ কিছু করে দেখানোর দৃঢ় সংকল্প, আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে এই ভ্রমণের মধ্যে আছে পৃথিবীর নানা স্থানের রহস্য, অজানাকে জানা, অচেনা কে চেনা বা খুঁজে দেখার আনন্দ৷ তাহলে চলুন আজ আমরা ঘুরে আসি এমন জায়গা থেকে যা ভয়ানক সুন্দর এক স্বপ্নের দেশ৷
বলা হয় যে কৈলাস পর্বত আর মানস সরোবরের তীর্থ যাত্রা সর্বশ্রেষ্ঠ৷ একবার যেতে পারলে মোক্ষ লাভ হয়৷ আর সাত বার যেতে পারলে জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায়৷ এই তীর্থ যাত্রা সত্যি ভীষণ কঠিন৷ এখানে যাওয়ার পথে নানারকম ব্যাধীতে আক্রান্ত হয়ে অনেক তীর্থযাত্রীর মৃত্যু ঘটে৷
নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে সাধারনতঃ মানস সরোবরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হয়৷ এই পথ এতটাই দুর্গম যে যাত্রা শুরুর প্রারম্ভ কালেই মনে আশঙ্কা জাগে এই যাত্রা সম্পূর্ণ হবে কিনা! কাঠমাণ্ডু থেকে ক্রমশ পথ যত মানস সরোবরের দিকে এগোতে থাকে তত আশঙ্কাও জেগে উঠতে থাকে৷ এই পথে নানা রকম বিপদ হাতছানি দিতে থাকে৷ যখন তখন চলার পথে আপনার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারে বিপদ৷
যে রাস্তা ধরে গাড়ী মানস সরোবরের পথ পাড়ি দিতে এগিয়ে যায় সেই পথে মাঝেমাঝেই ভূস্খলনের ফলে বিপদ ঘনিয়ে আসে৷ সেখানেই হয়ত পথের কোন বাঁকে আপনি দেখতে পাবেন পাহাড়ের অতল গহ্বরে ঝুলে আছে কোন গাড়ী যাতে হয়ত আপনার মত অনেক ভ্রমণ কারী ছিলেন যারা এই রোমাঞ্চ উপভোগ করতে যাচ্ছিলেন অথবা তা উপভোগ করে ফিরছিলেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই এই দৃশ্য আপনার মনে ভীতির সৃষ্টি করবেই কিন্তু তা স্বত্ত্বেও প্রকৃতির এই দুর্নিবার আহ্বানে সাড়া দিতে আপনি এগিয়ে যাবেন ঠিকই৷ এই রকম বিপদের সন্মুখীন হলে সেই দিনই নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব নয়৷ তাই সে রাতটা কোডারীতে কাটিয়ে দিন পরের দিন তিব্বতে পৌঁছানোর তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে৷
সবুজের ছোট্ট সমারোহ ছেড়ে তিব্বতের দিকে ক্রমশ ধাবমান হতে হতে মনে হয় যেন এই পথের কোন শেষ নেই৷ এগিয়ে যেতে চাইবেন ঠিকই কিন্তু এগোনোর পথ্ পাওয়া অতি দুষ্কর৷ এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাই যেন নেই৷ রাস্তার অবস্থা এমন যে একটু ভুল পদক্ষেপ আপনাকে ইতিহাস বানিয়ে দিতে পারে৷ আর এই ভয়ানক পথে মৃত্যুর হাতছানির দোসর হল অত্যধিক ঠাণ্ডা৷ নিশ্ছিদ্র রাতের অন্ধকার আর ঠাণ্ডা আপনাকে চিন্তা করতে বাধ্য করবে আপনি পরের দিনের সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে পারবেন কিনা?
যে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন আপনি জানলে খুশী হবেন দুর্গম পথ, অত্যধিক ঠাণ্ডা আর মৃত্যুর ডাক শুধু নয় এ পথে আপনার সঙ্গী খরস্রোতা/ তুখড় ব্রহ্মপুত্রও৷ এগোতে গিয়ে দেখতে পাবেন কখনো হয়ত এর কৃপাতে কোন সেতুর ধ্বংসাবশেষ শুধুমাত্র বিদ্যমান৷ পথ যতই দুর্গম হোক তিব্বতের গাড়ী চালকেরা এই রাস্তাতে বিপদকে পাশে নিয়ে গন্তব্যে এগিয়ে যেতে সত্যিই পারদর্শী৷
ভয়ানক পথের আরো ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন চুইগোম্পাতে পৌঁছানো যায় তখন কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে৷ এখানে পৌঁছতে পারলে আপনি বুঝতে পারবেন কিছুটা অন্তত মানস সরোবরের কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে৷ এই পথ অতিক্রম করতে খুব সাহসী লোকেদের মোটামুটি 2.5 দিন লাগে৷ এই রাস্তাতে ডোল্মা লা নামক স্থানও পড়ে যেই জায়গাটা সাধারণতঃ সকলে ইয়াকে চড়ে পাড় করে৷ ইয়াকে চড়েও শান্তি নেই৷ কারণ এক্ষেত্রেও অনেক সময় তার ওপর থেকেও পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী৷ আর সেক্ষেত্রে আপনার ভাগ্য ভালো হলে আপনার হাড় হয়্ত ভাঙ্গতে নাও পারে৷ পথে চলতে চলতে অতি অবশ্যই কিছুক্ষণ পর পর বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরী৷
অবশেষে আপনি ডেরাপুক পৌঁছলে এখান থেকে কৈলাস পর্বত দেখার সম্ভাবনা দেখা যায়৷ এখান থেকে কিছু ভালো ছবি আপনি সংগ্রহ করতে পারেন৷ কিন্তু যদি কুয়াশার পরিমান বেশী থাকে আপনি পর্বত শিখর দেখতে পেলেও তার নৈসর্গিক দৃশ্য আপনি ক্যামেরাবন্দী করতে পারবেন না৷
ডোল্মা লা-র পথে চড়াই এতটাই বেশী যে সে পথে এগোতে গেলে যতটুকু প্রাণশক্তি বাকী থাকে তাও প্রায় নিঃশেষ হওয়ার উপক্রম হয়৷ আর ইয়াকে চড়ে এই পথে যখন এগোতে হয় তখন অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে৷ ইয়াক যখন আরোহীকে নিয়ে খাড়াই পথের একদম প্রান্ত ধরে এগোতে থাকে তখন আপনি উপলব্ধি করতেই পারেন আপনি ও হয়্ত এই মুহুর্তে আপনার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন৷
মানস সরোবরের কাছাকাছি যখন পৌঁছাবেন তখন আপনাকে পায়ে হেঁটে এগোতে হবে৷ কিছুটা উতরাই পথে এগোলে আপনি নীচে গৌরী কুণ্ড দেখতে পাবেন৷ এখান কার রাস্তা তুলনামূলক ভাবে কিছুটা ভালো৷এঅবার আপনি উপলব্ধি করবেন এত ভয়ানক পথ অতিক্রম করে যখন লক্ষ্যে পৌঁছানো গেল তখন সেই কষ্ট যেন আর অবশিষ্ট রইল না৷ সেখানে পৌঁছে আপনি অধীর আগ্রহে সরোবরের দিকে ছুটে যেতে বাধ্য হবেন৷ সরোবরের নীবিড় সলিলে আপনি যখন নিবিড়তম হবেন আত্মা তথা শরীরে অনুভুত হবে অসীম শান্তি৷
ফেরার পথে আপনি এমন কিছু দৃশ্যের সন্মুখীন হতে পারেন, যা আপনার জীবনের স্মরণীয় কিছু মুহুর্ত হতে পারে৷ পথে যদি আপনি বৃষ্টি পেয়ে যান তবে সেই নৈসর্গিক দৃশ্যের সাক্ষী আপনি হতে পারেন৷ ফিরে আসার পরে পুরো যাত্রাপথের কথা একান্তে ভাববেন বা এই অভিজ্ঞতা যখন ভাগ করে নেবেন তখন উপলব্ধি করবেন প্রকৃতির সৌন্দর্য কত ভয়ানক হতে পারে আর তার আকর্ষণ কতটা তীব্র যে আপনি মৃত্যুর হাতছানিকেও উপেক্ষা করতে পেরেছেন
|