ভারতীয় তথা হিন্দু শাস্ত্রে সূর্যকে দেবতা রূপে পুজো করা হয়ে থাকে৷ দেবদেবীদের মধ্যে সূর্য এমন একজন যাকে আমরা দেখতে পাই৷ সূর্যের প্রকাশের ফলে পুরো সৃষ্টি দৃশ্যমান হয়৷ সূর্যের তাপে জল বৃষ্টির রূপ ধারন করে পৃথিবীর বুকে ঝড়ে পড়ে৷ সূর্যের আলোর প্রভাবেই পৃথিবীতে নানা প্রকারের উদ্ভিদ ও প্রাণী জগত তথা পুরো সৃষ্টি বর্তমান রয়েছে৷ সূর্যকে তাই ভগবান রূপে পুজো করা হয়ে থাকে৷ ভগবান সূর্যের এই দিব্য ক্রিয়াশক্তির কারণে ভারতীয় মুনি-ঋষিরা সূর্যকে আদিদেবতা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন৷ সনাতন বৈদিক বিচার ধারার পঞ্চদেবের মধ্যে ভগবান সূর্যকে বিশেষ সন্মান দেওয়া হয়৷ দেবতা রূপী সূর্যকে পুজো করার প্রথা শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয় সারা পৃথিবীতে প্রচলিত ছিল৷ ভারতবর্ষে সূর্যপুজোর একমাত্র নিদর্শন পাওয়া যায় কোনারকে৷ সেখানে এখন পুজো করা না হলেও সেখান কার সূর্য মন্দিরের অবস্থান থেকে বোঝা যায় এখানে কোন সময় সূর্য পুজোর রীতি প্রচলিত ছিল৷ প্রচীন এই সূর্য মন্দিরের মাহাত্ব তাই আজও বর্তমান৷ শুধু ঐতিহাসিক ভিত্তিতে নয় এই মন্দির গাত্রে খচিত নানা ভাষ্কর্য দ্বারা তত্কালীন সমাজের শিল্পভাবনার দিকটিও প্রকাশিত হয়৷ ভারতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিল তত্কালীন কলিঙ্গ রাজ্য৷ সেই রাজ্য বর্তমানে উড়িষ্যা নামে পরিচিত৷ এই উড়িষ্যা রাজ্যের নানা দর্শনীয় স্থানের মধ্যে কোনারকের সূর্য মন্দির একটি বিশেষ আকর্ষনীয় স্থান৷ উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় 65 কিমি এবং পুরী থেকে প্রায় 35 কিমি উত্তর-পূর্বে সমুদ্র তীরে অবস্থিত কোনারকের সূর্য মন্দির তার বাস্তুকলা এবং স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত৷পৌরাণিক মাহাত্বকোনারক নাম টি র মানে কিছুটা এই প্রকার --- কোন শব্দের অর্থ হল কোনা এবং অর্ক অর্থাত সূর্য ৷ সূর্যের গতির সঙ্গে ক্রম আগত সম্পর্ক স্থাপনের জন্য যে পবিত্র স্থল পৃথিবীতে রয়েছে তা কোনার্ক বা কোনারক নামে প্রসিদ্ধ৷ এই স্থানকে কোণাদিত্যও বলা হয়৷ আদিত্য শব্দের অর্থ হল সূর্য৷ পৌরাণিক তত্ত্ব অনুসারে এই স্থানকে প্রাচীন পরমক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে৷ প্রচলিত কথাকোনারকের সূর্য মন্দির সম্পর্কে এই কথা প্রচলিত রয়েছে- ভগবান কৃষ্ণ আর জাম্ববতীর পুত্র সাম্ব কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন৷ প্রচলিত আছে যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি ভগবানের আদেশ পেয়ে কোণাদিত্য ক্ষেত্র খুঁজতে বেড়িয়ে পড়েন৷ এই স্থানে এসে তিনি কমল অর্থাত পদ্মের ওপরে বসা ভগবান সূর্যের মূর্তি দেখতে পান৷ এই সূর্যের মূর্তির পুজা-অর্চনা করে সাম্ব কুষ্ঠ রোগ থেকে নিষ্কৃতি পান৷ তারপর সাম্ব এখানে এক বিশাল সূর্য প্রতিমা তৈরি করে এখানে প্রতিস্থাপন করেন৷ এই মূর্তিটি বর্তমানে পুরীতে রয়েছে৷ আজকে যে মন্দিরের ভগ্নাবস্থা আমরা দেখতে পাই তা 13 শতকে রাজা নরসিংহ দেব তৈরি করিয়ে ছিলেন৷ প্রচলিত আছে এই মন্দির নির্মান করতে রাজ্যের 12 বছরের আমদানী খরচ হয়েছিল৷ 1200 জন শিল্পী 12 বছর ধরে কাজ করে এটি নির্মান কার্য শেষ করতে পেরেছিলেন৷ এর দ্বারা সহজেই অনুমান লাগানো যায় এত দিনের পরিশ্রম এবং এত অর্থ খরচ করে যেই মন্দির তৈরি কর হয়েছিল তা কত বিশাল এবং বিশিষ্ট ছিল সেই সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে৷ কোনারকের এই সূর্য মন্দির সূর্যের রথের আকারে নির্মান করা হয়েছিল৷ পাথরের তৈরি 24 টি বিশাল চাকা সমেত এই রথটিকে সাতটি ঘোড়া টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন রূপ দেওয়া হয়েছে এই মন্দিরটিকে ৷ এই প্রাচীন মন্দিরটির বাস্তুশিল্প এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে মনে হয় ভগবান সূর্যের রথ আকাশে উড়ে যাচ্ছে৷ মন্দিরটির চারদিকে পাথরের ওপরে নানাপ্রকারের মূর্তি খোদাই করা হয়েছে৷ এতে বিভিন্ন যুদ্ধের দৃশ্য, পশু-পাখীর মূর্তি, দেবী- দেবতা, অপ্সরা, যক্ষ-যক্ষিনী , গন্ধর্ব যুগলের মূর্তি সহ কিছু প্রণয় রত যুগলের মূর্তিও রয়েছে৷ ঐতিহাসিক তথ্য কোনারকের সূর্য মন্দির বাস্তুকলা, শিল্প-কলা, নানাপ্রকারের মূর্তি এবং কল্পনার এক অদ্ভূত সুন্দর বাস্তব রূপ৷ এই মন্দিরের উচ্চতা 200 ফুট৷ বালি ভুমিতে কালো পাথরের তৈরি এই মন্দির পর্যটকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষনের কেন্দ্র বিন্দু৷ অনেক রাজার রাজত্ব এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলে এই মন্দির উপেক্ষিত হতে শুরু করেছিল৷ এর ওপরের অংশ ভেঙ্গে পড়ে গিয়েছিল৷ বলা হয় যে এই মন্দিরের গম্বুজের মধ্যে এমন চুম্বকীয় শক্তি ছিল যে তা 4 কিমি দূরে কোন জাহাজ চলাচল করলে এর এই চুম্বকীয় শক্তির দ্বারা সমুদ্র তটে চলে আসত এবং অনেক সময় তা ধ্বংস হয়ে যেত৷ হয়ত এই গম্বুজ টিকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে৷ এই মন্দিরে প্রতিস্থাপিত সূর্য মূর্তিটিকে পুরীতে নিয়ে রাখা হয়েছে৷ পরবর্তীকালে 1837 খ্রীষ্টাব্দে এই সূর্য রথ মন্দিরকে বাইরে বের করে আনা হয়৷ এর জন্য মন্দিরের অনেক অংশ ভগ্ন অবস্থায় দেখা যায়৷ তবু এখনও পর্যন্ত যা অবশিষ্ট আছে তা ভারতবর্ষে এমন মন্দিরের একমাত্র নিদর্শন৷ মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে দুটি বিশাল হাতিকে মারছে দুটি সিংহ এমন মূর্তি রয়েছে৷ এই মূর্তিগুলি হল এই রথ মন্দিরের প্রহরী৷ প্রবেশ দ্বারে প্রবেশ করার পরে সোপান পরম্পরা শুরু হতে থাকে যা মূখ্য মন্দির পর্যন্ত বিস্তৃত৷ |