|
|
|
পুরাতন ভৃত্য
, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
ভূতের মতন চেহারা যেমন নির্বোধ অতি ঘোর- যা-কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর৷ উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে- যত পায় বেত, পায় না বেতন, তবু না চেতন মানে৷ বড়ো প্রয়োজন, ডাক ই প্রাণপণ, চীত্কার করি 'কেষ্টা'- যত করি তাড়া নাহ ই সাড়া, খুঁজে ফিরি সারা দেশটা৷ তিনখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে তিনখানা করে আনে৷ যেখানে সেখানে দিবসে দুপুরে নিদ্রাটি আছে সাধা- মহাকলরবে গালি দেই যবে 'পাজি হতভাগা গাধা' দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে, দেখে জ্বলে যায় পিত্ত৷ তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার-বড়ো পুরাতন ভৃত্য৷৷
ঘরের কর্ত্রী রুক্ষমূর্তি বলে, 'আর পারি নাকো- রহিল তোমার এ ঘরদুয়ার, কেষ্টারে লয়ে থাকো৷ না মানে শাসন, বসন বাসন অশন আসন যত৷ কোথায় কি গেল-শুধু টাকাগুলো যেতেছে জলের মতো৷ গেলে সে বাজারে সারা দিনে আর দেখা পাওয়া তার ভার৷ করিলে চেষ্টা কেষ্টা ছাড়া কি ভৃত্য মেলে না আর!' শুনে মহা রেগে ছুটে যাই বেগে, আনি তার টিকি ধ'রে- বলি তারে, পাঁজি, বেরো তুই আজই, দূর করে দিনু তোরে৷' ধীরে চলে যায়, ভাবি গেল দায়৷ পরদিন উঠে দেখি হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি৷ প্রসন্ন মুখ নাহি কোনো দুখ, অতি অকাতরচিত্ত- ছাড়ালে না ছাড়ে, কী করিব তারে, মোর পুরাতন ভৃত্য৷৷
সে বছর ফাঁকা পেনু কিছু টাকা করিয়া দালালগিরি৷ করিলাম মন শ্রীবৃন্দাবন বারেক আসিব ফিরি৷ পরিবার তায় সাথে যেতে চায়, বুঝায়ে বলিনু তারে- পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, নহিলে খরচ বাড়ে৷ লয়ে রশারশি করি কষাকষি পোঁটলা পুঁটলি বাঁধি বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে গৃহিণী কহিল কাঁদি, 'পরদেশে গিয়ে কেষ্টারে নিয়ে অনেক কষ্ট পাবে৷' আমি কহিলাম, 'আরে রাম রাম, নিবারণ সাথে যাবে৷' রেলগাড়ি ধায়; হেরিলাম হায় নামিয়া বর্ধমানে কৃষ্ণকান্ত অতি প্রশান্ত তামাক সাজিয়া আনে৷ স্পর্ধা তাহার হেনমতে আর কত বা সহিব নিত্য? যত তারে দুষি তবু হনু খুশি পুরাতন ভৃত্য৷৷
নামিনু শ্রীধামে; দক্ষিণে বামে পিছনে সমুখে যত লাগিল পাণ্ডা, নিমেষে প্রাণটা করিল কন্ঠাগত৷ জন-ছয়-সাতে মিলি একসাথে পরম বন্ধুভাবে করিলাম বাসা; মনে হল আশা আরামে দিবস যাবে- কোথা ব্রজবালা, কোথা বনমালা, কোথা বনমালী হরি! কোথা হা হন্ত চিরবসন্ত! আমি বসন্তে মরি! বন্ধু যে যত স্বপ্নের মতো বাসা ছেড়ে দিল অঙ্গ৷ ডাকি নিশিদিন সকরুণ, ক্ষীণ, 'কেষ্ট, আয় রে কাছে, এত দিনে শেষে আসিয়া বিদেশে প্রাণ বুঝি নাহি বাঁচে৷' হেরি তার মুখ ভরে ওঠে বুক, সে যেন পরম বিত্ত- নিশিদিন ধ'রে দাঁড়ায়ে শিয়রে মোর পুরাতন ভৃত্য৷৷
মুখে দেয় জল, শুধায় কুশল, শিরে দেয় মোর হাত, দাঁড়ায়ে নিজ হুম, চোখে নাহি ঘুম, মুখে নাই তার ভাত৷ বলে বার বার, 'কর্তা, তোমার কোনো ভয় নাই, শুন- যাবে দেশে ফিরে, মাঠাকুরানীরে দেখিতে পাইবে পুন৷' লভিয়া আরাম আমি উঠিলাম, তাহারে ধরিল জ্বরে; নিল সে আমার কালব্যাধিভার আপনার দেহ' পরে৷ হয়ে জ্ঞানহীন কাটিল দু দিন, বন্ধ হইল নাড়ী- এতবার তারে গেনু ছাড়াবারে, এত দিনে গেল ছাড়ি৷ বহুদিন পরে আপনার ঘরে ফিরিনু সারিয়া তীর্থ৷ আজ সাথে নেই চিরসাথি সেই মোর পুরাতন ভৃত্য৷৷
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|  | |