ড: অনন্যা মজুমদার, অধ্যাপিকা
নারীত্ব-মৃত্যু : দু-চার কথা
আজও, 'নারীত্ব' এবং 'মৃত্যু' এই দুইয়ের ম্যাজিকে বুঁদ হয়ে আছে মানুষ৷ হ্যাঁ, সৃষ্টির ঊষাকাল থেকে বেলা বাড়লো কিন্তু এই নারীত্ব এবং মৃত্যু রহস্যের কিন্তু কোন কিনারা হল না৷ প্রযুক্তি নানা সমস্যার সমাধান করলে অধরা থেকে গেল সৃষ্টির আদি রহস্য৷ অতএব গা-জোয়ারি-ই সম্বল৷ সাম্প্রতিক কালের একটি নমুনা নেড়ে চেড়ে দেখা যাক৷
1934 সালের সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজিত National Socialist Women's Organisation - এর সভায় 'দ্য গ্রেট ডিক্টেটর' হিটলার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন - "Every child that a woman brings into the world is a battle, a battle waged for the existence of her people." ইতিহাসে পাথুরে প্রমান রয়েছে যে বিশুদ্ধ আর্য সংস্কৃতির পুর্নজাগরণের এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠার কারণে হিটলারের অধিকতর সংখ্যায় বিশুদ্ধ রক্ত বহনকারী সৈন্যের প্রয়োজন ছিল- যারা মরবে৷ তাই তাঁর বিবেচনায় নারীত্ব এবং মাতৃত্ব সমার্থক হয়ে যায়৷ সন্তান জন্মপ্রক্রিয়া বৃহত্তর স্বার্থে সংঘটিত "যুদ্ধ" অভিধা পায়৷
উল্লিখিত খণ্ডচিত্রটিকে বিক্ষিপ্ত এমন কী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সমাপতিত বলে ভাবা যেতেই পারে৷ সত্যি কথা বলতে কী, 'যুদ্ধ এবং মাতৃত্ব' এসব নিয়ে সম্প্রতি (এবং অনতিসম্প্রতিকালে) দেশে-বিদেশে বিস্তর গবেষণা চলছে৷ তার যেটুকু তথ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছয় তাও রীতিমত চিত্তাকর্ষক৷ কিন্তু এই লেখায় সে বিষয়ে আলোকপাত করা যাবে না৷ বরং চেষ্টা করা যেতে পারে আর ও দীর্ঘতর পথ অতিক্রমণের৷ সময়্সরণী ধরে আমাদের পৌঁছে যেতে হবে মহাভারতের কালে৷
মহাভারতে মৃত্যুর জন্ম এবং তারপর... মহাভারতের শান্তিপর্বে রয়েছে মৃত্যুর জন্মকথা৷ প্রজাপতি ব্রহ্মার প্রজাসৃষ্টির নেশায় ধরণী ভারাক্রান্ত, শ্বাসরুদ্ধ(জনবিস্ফোরণ - সেদিনও!)৷ ধ্বংসের দেবতা রুদ্রও অপারগ৷ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ব্রহ্মা ও চিন্তাকুল এবং অবশেষে ক্রুদ্ধ৷ ( সৃষ্টির অধিপতিকেও স্নায়ুচাপ আক্রমন করে)৷ আর পৌরাণিক নিয়ম মেনে সেই মুহুর্তে পিতামহ ব্রহ্মার সৃষ্টি সংহারী ক্রোধ থেকে আবির্ভাব ঘটলো তার৷ কৃষ্ণা মৃত্যু ৷ পরণে তার কৃষ্ণরক্তবাস, নয়নতলে কৃষ্ণবর্ণ, দিব্যালঙ্কারে সুসজ্জিতা সেই কন্যা ("কৃষ্ণরক্তাম্বরধরা কৃষ্ণনেত্রতলান্তরা৷ দিব্যকুন্তলসম্পন্না দিব্যাভরণভূষিতা৷৷" 253/37) দক্ষিণদিকে দণ্ডায়্মান হল৷ পুরুষের স্তুতিতে(না কি প্রস্তুতিতে!) নারী তো আদিযুগ থেকেই সৃষ্টিরূপিনী৷ জননীপদলাভেই নারীজন্মের স্বার্থকতা!
অথচ মৃত্যুকে সৃষ্টিকর্ত্তা আদেশ করলেন সৃষ্টি ধ্বংস করতে৷ অশ্রুমতী হল মৃত্যু৷ এই কানায় গলে পড়লো তার অসহায়তা৷ অবলা-প্রবলা ইত্যাদি প্রশ্ন এক্ষেত্রে গৌণ৷ ক্ষমতার আগ্রাসনে এখানে বন্দী রয়েছে, ব্যবহিত হয়েছে এখানে নারীত্ব, সেই মহাভারতের কালেই৷ শাসনশক্তি ব্যর্থ হয়েছে জনপ্রাবল্যরোধে, তাই রণাঙ্গনে নারীর প্রবেশ- রণনীতি নির্দ্ধারণে নয়- অক্ষক্রীড়ায় অক্ষের ভূমিকা কতটুকু!
তবু একমাত্র নারীই বোধহয় বোঝে যে আবেগ তার দুর্বলতা নয়, তর অন্তঃশক্তির সার৷ তাই মৃত্যু সযত্নে রক্ষা করলো তার অশ্রুবিন্দু, এরপর নত্নেত্রে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো -" এই ত্রিভুবলে কোথায এমন নারী আছে তার মত ভীষণা"("তয়া সৃষ্টা কথং নারী মাদৃশী বদতাম্বর৷ রৌদ্রকর্মাভিজায়েত সর্বপ্রাণীভয়ঙ্করী৷৷253/45) ৷অধ্রভীতা মৃত্যু কাতর মিনতি জানালো -"আমাকে ধর্মময় কর্ম আদেশ করুন"৷ (" ধর্ম্যমাদিশ কর্ম মে"৷৷253/46)৷ স্বভাবতঃই ব্রহ্মা সম্মত হলেন না৷ উপরন্তু মৃত্যুকে বারম্বার উপরোধ করলেন নির্দিষ্ট কর্ত্তব্য সম্পাদনের জন্য৷ সে অনুরোধ আদেশের ই নামান্তর৷ উপায়ান্তর না দেখে মৃত্যু কঠোর তপস্যা শুরু করলেন৷ ( মৌন অসহযোগের পরবর্তী পদক্ষেপ৷) অবশেষে ব্রহ্মা এক মধ্যপন্থী সমাধানসূত্র গ্রহণ করলেন৷ প্রজাপতি স্বয়ং তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে, এতে মৃত্যুর কোন অধর্ম নেই("অধর্ম্মো নাস্তি তে মৃত্যো"! 253/71), বরং ব্যাধিসংপীড়িত প্রজাকুল, পুরুষের স্বরূপে পুরুষ, স্ত্রীবিষয়ে স্ত্রী এবং নপুংসক ক্ষেত্রে তত্তত্স্বরূপে বিনষ্ট হবে৷ এই ব্যাধি জাত হল সেই নারীর অশ্রুবিন্দু থেকেই ৷ মৃত্যু নীরব হলেন৷ নারীর কন্ঠস্বর অবদমনের ইতিহাসের এ হয়তো প্রথম অধ্যায়৷
সে-ই প্রথম কিন্তু সে-ই শেষ নয়৷যুদ্ধে নারী পণ্য হয়, ভোগ্য হয়, ব্যবহূত হয় সর্বপ্রকারে৷ কিন্তু যুদ্ধ থেমে গেলেই তার ভূমিকা বদলে যায় কি? এই আলোচনার প্রথনমদিককার দু-চার কথায় এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে হিটলারের বক্তব্যের প্রসঙ্গ৷ যুদ্ধ থামলো৷ আটলান্টিকের ওপারের একটি খবরে চোখ বোলানো যেতে পারে৷ দ্বিতীয় বিশ্ব্যুদ্ধোত্তরকালের আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জনবিস্ফোরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যোগান দিলেন "Boom " শ্ব্দটির৷1951 খৃষ্টাব্দের 4ঠা মে -র New york Post -এ "Babies Equal Boom " - শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন- " Take the 3,548,000 babies born in 1950.Bundle them into a batch, bounce them all over the bountiful land that is America.What do you get? Boom. The biggest boomiest boom ever known in history.
যুদ্ধ পরবর্তী আর্থ-সামাজিক স্থিতাবস্থা তখন পারিবারিক জীবনে কথঞ্জিত সুস্থিতি এনে দিয়েছে৷ পুরুষ ঘরে ফিরেছে৷ নারী ঘরণী হয়েছ৷ এই সরল সমীকরণের অনিবার্য ফলাফল -" বুম"!
অর্থাত, নারীকে তার চিরন্তনী ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করা হল৷আপাত ভাবে এরকম মনে হলেও একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায় যে " বুম"-এর দায়ও বর্তাচ্ছে সেই নারীর ওপরেই৷ এই চক্রাবর্তনের কোন অন্ত নেই৷ নেই সমাধানও৷ তাহলে কি আমরা অপেক্ষা করবো মৃত্যুর জন্মের৷ কৃষ্ণকলি মৃত্যু বিধির নির্দেশে আবার ও সংহারমূর্ত্তি ধারণ ক'রে প্রজাবৃদ্ধি রোধ করবে৷ তার নেত্রতলের কৃষ্ণবর্ণের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে বিন্দু বিন্দু অশ্রু- তার নারীত্বের অবমাননার বিরুদ্ধে মৌন প্রতিবাদ৷
|