মুখ্য পৃষ্ঠা > অন্যান্য বিষয় > ওয়েবদুনিয়ার বিশেষতা 08 > কবিপক্ষ
পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়ামিত্রকে পাঠানএই পৃষ্ঠা প্রিন্ট করুন
 
কবি যখন চিত্রকর
সহেলি দাস

রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন তাঁর ছবি আঁকার সূচনা হয় তাঁর কবিতার পান্ডুলিপির কাটাকুটিতে৷ সৌমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই যে তথ্যটি দেয় তা হল তাঁর ছেলেবেলাতেই অঙ্কণে বেশ ভালো রকম হাতেখড়ি হয়৷ বিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর হিসেবে আবির্ভাব৷ বর্জিত শব্দকে কালি দিয়ে আড়াল করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই সাদা জমি ছেড়ে নকশা তৈরী করতেন৷ ঐ সাদা অংশ কখনও কোন কাল্পনিক প্রাণীর ধারালো দাঁতের সারি, কখনো বা জাফবির আকারপ্রথম পেত৷ প্রথম পর্যায়ে অবশ্য কাটাকুটিগুলি হত আকারহীন ধ্যাবড়া৷ দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে তৃতীয় কাল্পনিক জন্তু, লতাপাতা গোছের ইঙ্গিত৷ 'পূরবী'-র পান্ডুলিপির কাটাকুটি আসে তৃতীয় পর্যায়ে সারা পাতাময় কাটাকুটির খেলা যেন৷ আঁকলেন যত রকম অদ্ভুত আকৃতি৷ এক প্রাণীর মাথা জুড়লেন অন্য প্রাণীর শরীরে৷ 'পূরবী'র শেষ কয়েকটি লাইন পাতা দেখলে মনে পড়ে যায় সুকুমার রায়ের বকচ্ছপ মূর্তি৷ এর পরবর্তী পর্যায়ে যা কিছু আঁকলেন তাতে পুরোমাত্রায় রঙ এসে পড়েছে৷ বড় বড় সাদা কাগজে ছবি রচনা করলেন৷ সাদা জমি আর তার পাশে রঙের ছাপছোপ৷ ছবিগুলি হতে থাকল টান টান গতিময়৷ আঁকার বিষয় রইল সেই কল্পনা এবং আজগুবি জগত৷ আসলে রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই স্বাভাবিক বস্তুর প্রতিচ্ছবি বর্জন করে ঝুঁকেছিলেন যা কিছু বিশ্বসংসারে অদেখা কাল্পনিক বিমূর্ত, যা কিনা শুধু স্মৃতি বা স্বপ্নেই সম্ভব তাই তাঁর আঁকার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াল৷ প্রথম থেকেই মুক্ত ছিলেন তথাকথিত ব্যাকরণ থেকে, নিয়মের বন্ধন থেকে৷ তার ফলে ছবিগুলো হতে থাকল জগাখিচুড়ি ছবি৷ 1925-31 সালের মধ্যে তিনি ছবির ভাষায় আত্মপ্রকাশে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন৷ সবমিলিয়ে তাঁর ছবির সংখ্যা দুইহাজারের9 কিছু বেশী৷ কবির শেষ পর্যায়ের ছবিতে এল প্রাকৃতিক দৃশ্য-বস্তু, প্রতিকৃতি, স্থাপত্য, বৈঠকী গ্রুপ৷ তালে তাল মিলিয়ে চলল আলো, রেখা, পারস্কোকটিভ, গম্ভীরত্ব, ভাস্বর এবং অবশ্যই রঙের উপর তাঁর অসাধারণ খেল৷ তাঁর রঙের ব্যবহার এমন এক পথ নির্দেশ করল যা ভারতীয় ছবিতে আগে কখনও দেখা যায়নি৷ সারা শিল্পী জীবন ধরে তিনি ব্যবহার করেছেন কালি৷ অধিকাংশ ছবিই কালিতে আঁকা, কালিতে রঙ করা৷তাঁর প্রথম পর্যায়ের ছবিগুলো সব কালো কালিতে আঁকা৷ পরবর্তীতে একই রঙের কালিতে দুটি টোনে এঁকেছেন৷ গাঢ় আর ফিকে৷ একে একে এসেছে লাল, কালো আর নীল৷ সবশেষে একসঙ্গে এসেছে সমস্ত রঙ৷ খুন কমই তিনি ঘন ও ফিকের স্তর আলাদা করতেন৷ শেডিং ছিল না একেবারেই৷ কখনও মিশ্র রঙ ব্যবহার করেননি৷ শিল্পীর প্যালেট ব্যবহার করেননি তিনি৷ ছবিই তাঁর প্যালেট ছিল৷ তাঁর সবচেয়ে সার্থক কীর্তি তাঁর রঙ্গে এক দুর্লভ দ্যুতি ও ভাস্বরতা৷ সেই সঙ্গে যোগ হল প্রচন্ড ছন্দ, যে ছন্দ একান্ত কবি রবীন্দ্রনাথের৷ ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে তিনিই হলেন প্রথম শুদ্ধ ছবির জনক৷

1937 সালের জুন মাসে উইলিয়াম রোটেনন্টাইনকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "আততায়ীর মতো নির্মম স্বাধীনতা নিয়ে ভারতীয় শিল্পের আত্মতুপ্ত ও বদ্ধ জগতকে আমি তছনছ করে চলেছি এবং আমার স্বদেশীয়র৷ হতভম্ব কারণ তারা জানে না আমার ছবি সম্বন্ধে কি অভিমত তারা দেবে৷" এমনই অভিমানের সুর বেজেছে সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে লেখা চিঠিতে(01.04.1930)৷ লেখেন, ছবি আর 'য়ুরোপ' থেকে 'জন্মভূমিতে' ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন না৷ 1924 সালে সান ইসিদ্রোতে ডিকতোরিয়া ও কামপো তাঁর ক্যামেরায় তুলে রাখেন পূরবীর পান্ডুলিপির আঁকিবুকি৷ 1930 সালে কবির হৈমন্ত-ফসল চারশোটি ছবি নিয়ে শুরু হয় প্যারিসের প্রদর্শনী৷

রবীন্দ্রনাথের ছবির জগতে রঙের ব্যবহারে রয়েছে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচার৷ রঙের অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ ব্যবহার দর্শককে পৌঁছে দেয় আশ্চর্য অস্থির এক পৃথিবীতে৷ রং এসেছে কখনো সান্নিধ্যের উষ্ণতা নিয়ে আবার কখনও দূরত্বের উদারতায়৷ তাঁর ছবিতে লাল রঙের ব্যবহার একাধারে উত্তেজনার সৃষ্টি করে ও নাটকীয়তার উত্তাপ আনে৷ কোনরকম প্রতীকের সীমিত অর্থে রঙ আসেনি তাঁর কাজে৷ নালরভাটি বিশেষত এসেছে নারীমূর্তির রচনায়৷ বোধকরি রহস্যের আবেশ ও দূরত্বের আমেজ এনে দিতে৷ আবার কয়েকটি নিসর্গাচিত্রেও এসেছে হাঁলকা নীল৷ কিছু ল্যান্ডস্কেপে সবুজ ও হলদের রসায়নে অনুরণিত হয়েছে প্রকৃতির হর্ষ৷ তাঁর ভীষণ কালো রঙটিকে ব্যবহার করেছেন কতগুলি রহস্যময় ও তমসাচ্ছন্ন আত্মপ্রতিকৃতিতে৷

বড়ছন্দময় ছিল রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা৷ আর এককভাবে বলা যেতেই পারে এই সুদর্শন ক্যালিগ্রাফিতেই তাঁর ছবির আঙ্গিকের উত্স৷ কেউ বা বলেন ক্যালিগ্রাফিক রেখাই তাঁর ছবির ভিত্তি৷ সে যাই হোক৷ তবে তাঁর লেখা এবং আঁকা কাজদুটির মধ্যে সাদৃশ্য পাওয়া যায়৷ আর একটু নজর করে দেখলে ধরা যাবে, রবীন্দ্রনাথের বাংলা এবং ইংরেজী হাতের লেখায় রেখার গতিভঙ্গি প্রায় এক৷ 'লেখন' - এর ভূমিকা অংশে নজরে আসে ইংরেজী cursive লেখার গতিভঙ্গিই বাংলাতে এসেছে তাঁর হাতে৷

আঁকার জগতে রবীন্দ্রনাথের বিশাল কর্মকান্ডকে, তাঁর ছবির মেজাজকে বুঝতে পারা এবং বুঝিয়ে বলা দুচার কথায় প্রায় অসম্ভব৷ বোধকরি তাঁর স্বরচিত ভাষ্য তাঁর চিত্রকলা অনুভবের সার্থক সহায়ক৷ চিত্রলিপির ভূমিকায় তিনি বলেছেন , ''লোকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে, আমার ছবির অর্থ কি৷ আমার ছবিরা যদি এর উত্তর না দিয়ে থাকে, তবে আমিও নিরুত্তর৷ তাদের সার্থকতা প্রকাশে, অর্থবহনে নয়, তাদের পিছনে কোন চিন্তণীয় বক্তব্যও লুকিয়ে নেই৷ ওদের যেটুকু দেখা যাচ্ছে, সেটুকুর কোন মূল্য যদি থেকে থাকে, তবেই ওরা টিঁকবে; নইলে, ভেতরে যতোই নীতিবাগীশ বা বৈজ্ঞানিক সত্য থাক না কেন, ওরা সহজেই বাতিল হয়ে বিস্মৃতির অগম পারে৷"
অতিরিক্ত
রবীন্দ্র চিন্তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
প্রণাম করি পায়ে, বন্ধু বলে দুহাত ধরি নে
রহস্যময় রাজ বাড়ি: ইরাবতী
বিবি ও রবি
রাণুর ভানুদাদা- ভানুদাদার রাণু
ব্যঞ্জনবর্ণ