মুখ্য পৃষ্ঠা > অন্যান্য বিষয় > ওয়েবদুনিয়ার বিশেষতা 08 > কবিপক্ষ
পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়ামিত্রকে পাঠানএই পৃষ্ঠা প্রিন্ট করুন
 
রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর আধুনিক চিন্তা

ড: প্রদীপ বস

পাশ্চাত্ত্য আধুনিক সভ্যতা শুরু হয়েছিল মোটামুটি 14 শতকের ইউরোপীয় রেনেশাঁসে আর তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে 18 শতকে, ইউরোপীয় এনলাইনটেনমেন্ট৷এই পাশ্চাত্ত্য আধুনিকতা নিজেকে সারা বিশ্বে আদর্শ মডেল হিসাবে দাবি করেছে৷ অন্য সব সংস্কৃতি, সভ্যতা,জ্ঞান-বিজ্ঞান যেন তার তুলনায় নিকৃষ্ট৷ পাশ্চাত্ত্য আধুনিকত হল আলোকজ্জ্বল, সুসভ্য, প্রগতিশীল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সবচেয়ে অগ্রসর, সংস্কৃতিতে উন্নততম৷ কিম্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবির ফাঁক-ফোকর ও অসীমাবদ্ধতাকে তাত্ত্বিক দিক থেকে তুলে ধরেছে ফুকো-দেরিদা-লিওতারদের উত্তর আধুনিক তত্ত্ব৷

অবাক হয়ে ভাবি আজ থেকে কত বছর আগে রবীন্দ্রনাথও পশ্চাত্ত্য আধুনিকতার বাইরে এই চোখ ধাঁধাঁনো খোলসের অন্তঃসারশুণ্যতাকে উন্মোচিত করেছিলেন৷ তার আড়ালে ডাকা নির্লজ্জ লোভ, ভোগবাদ , প্রভুত্বলিপ্সা, যান্ত্রিকতা ও হিংস্রতাকে চিহ্ণিত করেন তিনি৷ আধুনিক মানুষ গর্বোদ্ধত, প্রকৃতিকে সে জয় করতে চায়, ভোগ করার জন্য৷ উত্তর আধুনিক তত্ত্ব এর বিপরীতে প্রকৃতি সম্পর্কে এক শ্রদ্ধার মনোভব পোষণ করে৷ রবীন্দ্র নাথও বিনম্র চিত্তে গেয়েছেন "আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর প্রাণ৷" তাঁরা অজস্র কবিতায়, গানে নাটকে, শান্তিনিকেতনের কর্মকান্ডে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল মানবজীবনের কথা প্রকাশ পেয়েছে৷ তেমনি তাঁরা শেষ জীবনে লেখা "সভ্যতার সংকট" প্রবন্ধে পাশ্চাত্ত্য আধুনিক সভ্যতার লোভ ও নিষ্ঠুরতা ধিক্কৃত৷ আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহ মৃত্যুলীলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বাভাস সেখানে৷ পশ্চিমি যন্ত্র সভ্যতার এই অমানবিকতাকে বিশ্লেষণ করেছে উত্তর আধুনিক তত্ত্বও আমরা দেখেছি আধুনিক জাতি- রাষ্ট্র (nation- state) ইউরোপে উদ্ভূত হয়ে ক্রমস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে৷ কী ভীষণ তার ক্ষমতা৷ সে ব্যক্তি ও সন্ত্রাসবাদকে দমন করে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানা৷ রবীন্দ্রনাথ ও তার 'ন্যাশলানিজম' প্রবন্ধে এই 'নেশন' ধারনার তীব্র সমালোচনা করেছিল৷ কারণ এতে জাতিতে-জাতিতে সংঘর্ষ বৃদ্ধি পায়৷ আজকের দিনে উত্তর আধুনিক চিন্তায় দেখানো হয়েছে কিভাবে এই নেশন স্টেট তার অভ্যন্তরে বিভিন্ন পার্থক্যে চাপা দিয়ে রাখে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে মুছে দেয়, গোষ্ঠিগত ও সম্প্রদায় গত বিবিধ সত্তাকে প্রান্তে নির্বাসিত করে৷ এই ছাঁচে গড়ে নিতে চায় সকলকে৷ একে বলে সমধর্মীকরণ ( homogenization)| 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথও বলছেন, বিলাত রাষ্ট্র প্রধান, কিন্তু এ দেশ সমাজ প্রধান৷ অথচ ব্রিটিশ শাসন এই সম্পর্কে বিকৃত করেছে৷

উত্তর আধুনিক তত্ত্ব ক্ষমতার যে আধুনিক তন্ত্রজাল, যা প্রায়্শ অদৃশ্য, তাকে উন্মোচিত করে৷ প্রান্তিক ও উপেক্ষিত জনের যে প্রতিরোধ তাকে তুলে ধরে৷ ক্ষুদ্র ও দুর্বলের শক্তি তা যত নগন্যই হোক তার প্রতি তার মনোযোগ৷ 'রক্তকরবী'- তেও রাজা বলছে " শক্তির ভার কেমন করে নিজেকে পিষে ফেলে, সেই পাহাড়টাকে দেখে তাই বুঝলুম৷" 'মুক্তধারা'য় মন্ত্রী রঞ্জিতকে বলে " রাজকার্যে ছোটদের অবজ্ঞা করতে নেই! মনে রাখবেন, যখন অসহ্য হয় তখন দুঃখের জোরে ছোটরা বড়দের ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে৷ রবীন্দ্রনাতহ ধনঞ্জয়ের কন্ঠে শুনিয়েছিলেন, " আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে৷" উত্তর আধুনিক তত্ত্বের কতদিন আগেই রবীন্দ্রনাথ জানতেন সমাস উন্নয়ন মানে গ্রামের উন্নয়ন৷ এমনকি শ্রীনিকেতন তিনি কুটির শিল্প, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, দেশজ গাছ গাছড়া, ভেষজ এসবের উপর জোর দিয়েছিলেন৷

অবশ্য একটা অনস্বীকার্য যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানব, পরম সত্য, পাচ্য ও পাশ্চাত্ত্যের মিলন, যুক্তিনিষ্ঠ মানবসত্তা, প্রগতির পথে সভ্যতার জয়যাত্রা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো ইত্যাদি ধারনায় বিশ্বাসী৷ উত্তর আধুনিক তত্ত্ব সেরকম ভাবনার নির্মম সমালোচক৷ ফুকো যে জ্ঞান? ক্ষমতা যুগল, দেরিদা যে সত্যের নিরন্তর বিনির্মাণ(deconstruction) -এর কথা বলেন তা সেদিন রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় অধরা ছিল৷

লেখক স্কটিশচার্চ কলেজের অধ্যাপক
অতিরিক্ত
কবি যখন চিত্রকর
রবীন্দ্র চিন্তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
প্রণাম করি পায়ে, বন্ধু বলে দুহাত ধরি নে
রহস্যময় রাজ বাড়ি: ইরাবতী
বিবি ও রবি
রাণুর ভানুদাদা- ভানুদাদার রাণু