সহেলী দাস
রবীন্দ্রনাথের পথ চলার আবেগ তাঁর অধিকাংশ নাটকেই জড়িয়ে রয়েছে চেতনে অবচেতনে৷ 'আগে চল, আগে চল ভাই৷' জীবনব্যাপী এই চলার কথাই বলেছেন৷ তাঁরই রচনা থেকে কয়েকটি লাইন, 'পথ দিয়ে কে যায় গো চলে\ডাক দিয়ে সে যায়\ আমার ঘরে থাকাই দায়\ পথের হাওয়ায় কী সুর বাজে\ বাজে আমার বুকের মাঝে\ বাজে বেদনায়৷৷' কেমন সে পথ? পেয়েছিলেন কি? পাওয়া যায় সে পথ? পথে নিষ্ক্রমণের ইচ্ছেটা বেদনা হয়ে যেন বড় বেশী বাজে তাঁর 'ডাক ঘর' নাটকে৷ ঘরের মধ্যে বসে অমল শুনতে চায়, শুনতে পায় দূরের অতিদূরের কাল্পনিক ডাক৷ রবীন্দ্রনাথের এই সময়কালের একটি চিঠিতে পাই- 'বেরো, বেরো, বেরো, রাস্তায বেড়িয়ে পড়, ফাঁকায় ছুটে আয়, আর একডন্ড ঘরে নয়,...৷' ডাকঘর নাটকটি তাঁর নিজের মৃত্যুকল্পনা অবলম্বনেই লেখা৷ নাটক বলাকা কাব্যপর্বে রচিত৷ বলাকার মধ্যে যে চলার বেগ, তাই নাট্যরূপে নবযৌবন দলের পদ যাত্রার অভিযান৷ তাই তো তারা বলে, 'চলি গো চলি গো যাই গো চলে৷' প্রসঙ্গত বলাকার কবিতাটি স্মরণযোগ্য 'হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে৷' এই অন্য কোনখানের খোঁজই যে করেছেন তিনি৷ রবীন্দ্রনাথের নাটকে অন্ধ বাউল গান গেয়ে পথ দেখতে পায়৷ বুঝতে অসুবিধা হয় না পথ তাঁর অন্তর সত্তাটিকে কি গভীর ভাবে 'আবিষ্ট' করেছিল৷ রবীন্দ্রনাটক অচলায়তন, রাজা, তাসের দেশ, প্রকৃতির পরিশোধ, মুক্তধারা, শারদোত্সব এসবই তার আগমনের নান্দীমুখ, তা হল রক্তকরবী৷ রবীন্দ্রনাথ এই নাটকটি রচনায় সর্বাধিক সংখ্যায় খসড়া ব্যবহার করেছেন৷ বলতে ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথের নিবিড়তম নাটক৷ সেই রক্তকরবীতেও পথের কথা৷ পথের ধারেই যেন নাটকটি আবর্তিত৷ পথে পথেই নন্দিনী খুঁজেছে রঞ্জনকে৷ বিশু পাগল পথে পথে গান গায়৷ রাজ্য যক্ষপুরীতে তার তৈরী নিয়মের জাল আটক, তার পথে বের হবার উপায় নেই৷ অবশেষে রাজা সেই জাল ছিঁড়ে পথে বের হয়৷ তাকে যে পথের পথিক হতেই হয়৷ কারণ পথই যে মুক্তির সুর বহন করে৷ অর্থাত অভ্যস্ত জনজীবন থেকে বার বার মুক্তি দিতে পারে একমাত্র পথ৷ অমোঘ রূপে পথ এসেছে বাধা বন্ধন ছিন্ন করেছে পথ রবীন্দ্রনাটকে৷ আর পথের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছন্দ৷ অনিবার্যভাবে৷ বর্তমান এই ভীষণ সময়-এই রক্তকরবীর মত রচনা বড় বেশী রকম প্রাসঙ্গিক৷ তাঁর লেখাতেই পাই 'এক ঝোঁক হলেই তাল কাটে' সমাজে৷ কেবল 'রথযাত্রা'-তেই নয়, একই ছন্দ তালের কথা রক্তকরবীর অংশেও৷ রাজার মনে হয় নন্দিনীর মধ্যে যেন আছে 'বিশ্বের বাঁশিতে নাচের যে ছন্দ বাজে সেই ছন্দ৷' আর এই ছন্দোময় জীবনই যে ইশারা দেয় অবিরত পথ চলার৷
আর এই পথ ধরে চলতে চলতে যখন আমরা আজও হঠাত থমকে দাঁড়াই, শুনতে পাই যেন হুড়মুড় শব্দে পৃথিবীটা ভেঙ্গেচুরে পড়ছে৷ তখন যেন মন খুঁজতে চায় নন্দিনীকে৷ উপলদ্ধি করি স্বরচিত যন্ত্রের হাতে মানুষের পীড়ণ৷ জিনিসপত্রের উপচয়ে প্রাণের অপচয়৷ আর তাই বোধহয় বারবার আশ্রয় খুঁজতে থাকি তাঁরই রচনায়, নাটকে৷ তিনি আড়ালে আছেন আবার সন্মুখেও আছেন৷ প্রবলভাবে৷ তাঁর উপস্থিতির প্রাসঙ্গিকতাকে এতটুকু কম বুঝলে আমরাই ভয়ংকর অসহায়, বিপন্ন বোধ করি৷ তাঁর 'চতুরঙ্গ' উপন্যাসটি নাটক রূপে পাওয়া গেল সম্প্রতি ব্রাত্য বসুর পরিচালনায়৷ 'চতুরঙ্গ' কেন? তবে কি সেই অতিমাত্রায় প্রাপ্তিতে চরম অনীহা৷ Rejection! হবে হয়তো৷ পথ তো তাঁরই আঁকা৷ আর একটু এগিয়ে যাই৷ খুঁজতে থাকি৷ যদি আচমকা আলোর মত পেয়ে যাই অমলের কাল্পনিক দেশটা৷ আর পথের বেদনাটা তো সুর হয়ে বাজবেই অবিরত৷
|