'' চিত্ত যেথা ভয়শুণ্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর..."
সালটা 1861, বাংলার পঁচিশে বৈশাখ৷ কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে ঘর আলো করতে এলেন এক দেবশিশু৷ নাম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ আদুরে নাম-রবি৷ তত্কালীন সমাজে ঠাকুর বাড়ির এমনিতেই ছিল সাংস্কৃতিক কলা-কেন্দ্রের অন্যতম পীঠস্থান৷ রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই ছিলেন ব্রাক্ষ্ম সমাজের এক কর্তা৷
এছাড়াও ঠাকুর বাড়ির সাংস্কৃতিক আবহমন্ডলের জন্যই রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখা যায় কবি প্রতিভার ঝলক৷ মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন৷ শুরু সেখানেই৷ তারপর একে একে বাঙালা সাহিত্যের স্বর্ণ ফসল ফলিয়েছেন রবি ঠাকুর৷
কবিতা লেখাতে মনোযোগী হলেও 'ইস্কুলে' যেতে আপত্তি ছিল রবি ঠাকুরের৷ প্রথম থেকেই মানুষ তৈরীর জাতাকলে প্রতি তাঁর ছিল তীব্র অনীহা৷ ঘরে বসেই বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে থাকেন তিনি৷ কিন্তু 1878 সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্রিটেনে যেতে হয় তাঁকে৷ মাত্র সতেরো মাসের মধ্যেই ব্রিটেনের পাঠ সাঙ্গ করে ফিরে আসেন তাঁর সোনার বাংলায়৷ 1883 সালে মৃণালীনি দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন৷
ঘরে বসে থাকার লোক কোনদিনই ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ৷ পিতার সম্পত্তি রক্ষার জন্য বহু গ্রামে-গঞ্জে ঘুরতে হয়েছে তাঁকে৷ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে বসবাস করেছেন তিনি৷ তাদের আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, বাচন ভঙ্গি, হিংসা, বিদ্বেষ, শ্লেষ, খুশীর আবহ ভীষণ ভাবে ছাপ ফেলেছিল রবি ঠাকুরের উপর৷ গ্রামীণ বাংলার জীবন তিনি মনে গেঁথে নেন৷ 'গল্প-গুচ্ছ' - এ সেই অজানা- অচেনা গ্রাম্য জীবনকেই ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি৷
1901 সালে কবিগুরু প্রতিষ্ঠা করলেন শান্তিনিকেতন৷ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবন খুব একটা সুখকর হয়নি৷ দুঃখের স্রোতে তাঁর মনও ভারাক্রান্ত হয়েছে৷ পর পর নিজের স্ত্রী,পুত্র এবং কন্যাকে চোখের সামনে চলে যেতে দেখেন তিনি৷ 1910 সালে প্রকাশিত হয় তাঁর 'গীতাঞ্জলী'৷ নিজেই গীতাঞ্জলী-র ইংরেজী অনুবাদ করেন৷ 1913 সালে 'গীতাঞ্জলী'-র জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে সন্মানিত হন তিনি৷ 1915 সালে নাইটহুড৷ ভারতের উত্তাল স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে নিজেকে কখনই দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ৷ নিজের কবিতা এবং প্রবন্ধে ভারতের স্বাধীনতাকে সবসনয় উত্সাহ জুগিয়েছেন৷ তবে রবীন্দ্রনাথ কখনই উগ্র দেশপ্রেমকে গুরুত্ব দেননি৷ তাঁর ধারণা ছিল বিশ্বভ্রাতৃত্বপ্রেম৷ হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়তে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি৷ দেশবাসীর উপর অত্যাচার কখনই মেনে নেননি তিনি৷ জালিওয়ানবাগের নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে নাইটহুড ত্যাগ করেছিলেন৷ 7-ই আগষ্ট বাংলার 22-শে শ্রাবণ এই মহান আত্মা পরলোকগমন করেন৷
বাংলা সাহিত্য এবং বাঙালীর জন্য তিনি রেখে গেছেন অমূল্য সাহিত্য ভান্ডার৷ যা আমরণ মনে রাখবে বাঙালী সমাজ৷
তথ্য সংকলণ- বাংলা ওয়েবদুনিয়া
|