মুখ্য পৃষ্ঠা > অন্যান্য বিষয় > ওয়েবদুনিয়ার বিশেষতা 08 > কবিপক্ষ
পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়ামিত্রকে পাঠানএই পৃষ্ঠা প্রিন্ট করুন
 
স্মৃতির টুকরোগুলো...একান্তে আশ্রমকন্যা রমা চৌধুরী

বয়স- মাত্র 95, তাতে কি? কবিগুরু সম্পর্কে এখনও তাজা স্মৃতি জড়িয়ে আছে রমা চক্রবর্তী৷ রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে গান শিখিয়েছিলেন তাঁর এই ছাত্রীকে৷ সেই গানের সুর আজও তাঁর কানে ভাসে৷ কবিগুরু ছাত্রীদের মধ্যে একমাত্র জীবিত তিনি৷ কবিপক্ষের সেই স্মৃতি উসকে দিলেন বৃদ্ধা তরুণী৷ বাংলা ওয়েবদুনিয়ার সাংবাদিক সোমনাথ বিশ্বাসকে একান্ত সাক্ষাত্কারে জানালেন বিশ্বকবির সঙ্গে তাঁর সেই স্মৃতির টুকরোগুলো...

'' 25শে বৈশাখের দিনটি মন খারাপ হয়ে যায়৷ মনে পড়ে যায় 22শে শ্রাবনের কথা, মনে পড়ে পুরোনো স্মৃতিগুলির কথা৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে বসে গান শেখা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে বসে অনুষ্ঠান করা সবই মনে পড়ে যায়৷

1930 সালে আমি প্রথম শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম শিক্ষা লাভের জন্য৷ তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদেশে ছিলেন৷ কিছুদিন পর তিনি আবার শান্তিনিকেতনে ফিরে এলেন৷ প্রথম যেদিন এই ঋষিতুল্য মহামানবকে দেখি সেই দিন মনের অনুভূতি ঠিক কিরকম ছিল তা বলা খুব কঠিন৷ তবে তাঁকে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম আবার আনন্দও পেয়েছিলাম৷

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাকে প্রথমে ক্লাসিক্যালের উপর রিসার্চের কাজ দিয়েছিল৷ আমি যাতে কোন রকম অসুবিধায় না পড়ি তার জন্য মনসা মঙ্গল ও আরও কয়েকটি বইয়ের নাম করে বলেছিলেন- ''পড়''৷ পরে রিসার্চের কাজ করতে গিয়ে কোন অসুবিধায় পড়লে তিনি নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন বা দেখিয়ে দিয়েছেন৷ কোনকিছু ভুল হলে কারুকে বকাঝকা করতেন না৷ তার ভুলটা ধরিয়ে দিতেন৷

আমরা যখন গান শিখতাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমাদের সামনে চেয়ারের উপর বসে থাকতেন৷ তিনি খুব কাছের মানুষ ছিলেন৷ কারুর কিছু ভুল হলে উনি অনেক সময় নিজের হাতে দেখিয়ে দিতেন৷ আমি একবার "যদি হায় জীবন পুরণ নাই লহ মন" গানটি ঠিক করে করতে গাইতে পার ছিলাম না৷ তিনি সেই সময় আমার সামনেই বসে ছিলেন৷ আমার খারপ পরিস্থিতি দেখে তিনি নিজেই আমাকে গানটি কিভাবে করতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন৷ এছাড়াও ইনি মাঝে মাঝে গানের ধারণা, গানের সঙ্গে নৃত্যের ভাব তিনি সবই বুঝিয়ে দিতেন৷ তাঁর একটায় আদেশ বা উপদেশ ছিল তা হল যেন কোন ভুল না করে৷ কেউ ভুল করলে উনি খুব দুঃখ পেতেন৷ গান শিখতে শিখতে আমাদের নিয়ে মঝেমধ্যেই নিরেন্দ্র নাথ চৌধুরি অনুষ্ঠানের জন্য রিয়ার্সাল দেওয়াতেন৷ মাঝে মধ্যেই অনুষ্ঠান হত৷ গান, কবিতা, আবৃতি, নাচ সবই হত অনুষ্ঠানে৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুষ্ঠান দেখতে ভালোবাসতেন৷

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিশাল সমুদ্র ছিলেন৷ তাঁর সম্পর্কে যতটাই বলা যায় ততটাই কম হবে৷ এত ব্যস্ততার মধ্যেও যে উনি কখন লেখালিখি করতেন তা বুঝে উঠতে পারতাম না৷ অনেক লোক আসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে৷ এছাড়াও আমাদের শেখাতেন, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন৷ তবুও সত ব্যস্ততার মধ্যে তিনি লেখার জন্য সময় বের করে নিতেন৷ তিনি একসময় নিজে গানও করতেন৷ তবে শেষের দিকে গান করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ তবে গান শুনতে খুব ভালোবাসতেন৷ সাধারণত নিজের রচনা করা গানই শুনতেন৷

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝের মধ্যে মজার কথাও বলতেন৷ একবার আমার মনে পড়ছে 1939 সালে আমি তখন ভাগলপুর থেকে শান্তিনিকেতনে গিয়েছি৷ একজন এসে আমাকে বললেন বাবা মশায়(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেবকরা তাঁকে বাবা মশায় বলে ডাকতেন) আপনাকে ডাকছেন৷ আমি যেতেই উনি বলে উঠলেন "তোর যে ভাগলপুরে ভাগল ভাগল হয়, এখানে এসে আমার কাছে থাক৷" উনি খুব নরম মনেরও মানুষ ছিলেন৷ কারুর শরীর খারাপ হলে উনি নিজেই ওষুধ দিতেন৷ খোঁজ খবর নিতেন৷

শান্তিনিকেতনে থাকতে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পয়লা বৈশাখের দিন পালন করা হত৷ 25শে বৈশাখ আসতে আসতে শান্তিনিকেতনের জল শুকিয়ে যেত৷ তাই পয়লা বৈশাখের দিনটিকেই জন্মদিন হিসাবে পালন করা হত৷ নাচ, গান, কবিতা, আবৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিনটি ধুমধাম করে উদযাপিত হত৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসতেন, চেয়ারে বসে অনুষ্ঠান দেখতেন৷ তবে সব থেকে একটি আশ্চর্য বিষয় ছিল উনার গলায় মালা পরিয়ে দেওয়ার পর যতক্ষন তিনি থাকতেন মালাটি পরেই বসে থাকতেন৷ খুলে ফেলতেন না৷''
অতিরিক্ত
রবীন্দ্র জীবনী
পথ খুঁজে ফিরি
একান্তে শ্রীকান্ত আচার্য
কবির আরশিতে কবি
রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর আধুনিক চিন্তা
কবি যখন চিত্রকর