|
|
মিনতী রায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, "আমার কবিতা, জানি আমি, গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্ব্বত্রগামী"
কিন্তু আমরা জানি পৃথিবীতে এমন কোন স্থান নেই যেখানে তাঁর সাহিত্য প্রবেশ করেনি৷ কিংবা এমন কোন মানুষ নেই যার অন্তরের গভীর গোপন কথাটি বের করে তিনি তাঁর কাব্য ভান্ডার সমৃদ্ধ করেনি৷ তিনি ছিলেন সার্ব্বভৌম কবি৷ রবীন্দ্র সাহিত্যের মূল সুরটি হল মানব প্রেম ও প্রকৃতি প্রেম৷ তিনি বলেছিলেন- "মরিতে চাহীনা আমি সুন্দর ভূবনে মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই" তিনি আরও বলেন- "মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক" কবি জীবনে জীবন যোগ করে কবিতা রচনা করেন৷ তাই তাঁর কাব্যে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, তরুণ সকল জনের কথা প্রকাশিত হয়৷
একদিকে যেমন তিনি শিশু মনস্তত্বকে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তেমন শিশু মনের বিচিত্র সাধকে রূপ দিয়েছে৷ "ইচ্ছে করে শ্লেট ফেলে দিয়ে, অমনি করে করে বেড়াই নিয়ে ফেরী", অথবা "আমি হতাম যদি বাবুদের ঐ ফুল বাগানের মালি", কখনও তার ইচ্ছে করে "কানাই মাষ্টার" হতে কখনও "বীর পুরুষ"৷
"রাঁধার পরে খাওয়া আবার খাওয়ার পরে রাঁধা, বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা৷" নারী শক্তির এই অপচয় তিনি মেনে নিতে পরেন নি৷ তাই তিনি গর্জে উঠেছিলেন, "নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার৷"
শুধু দিন যাপনের, শুধু প্রাণ ধারনের গ্লানি বহন করার ফলে যাদের জীবন শক্তি নিঃশেষিত প্রায়, তাদেরকে উজ্জীবিত করার জন্য তিনি তরুণদেরকে আহ্বান করে বলেন- "ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা ওরে সবুজ, ওরে অবুজ আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা"
মানবের প্রতি মানবের অত্যাচার যে কত অসীম, মানুষ যে কত অসহায়, তার সুষ্পষ্ট চিত্র অমরা "এবার ফিরাও মোরে" কাব্যটিতে পাই৷ "স্ফীতকায় অপমান অক্ষমের বক্ষ হতে রক্র শুষি করিতেছে প্রাণ লক্ষ মুখ দিয়া৷ সংকুচিত ভীত ক্রীতদাস লুকাইছে ছদ্মবেশে৷
কিংবা - "শুধু দুটি অন্ন খুটি কোন ম্তে কষ্ট ক্লিষ্ট প্রাণ রেখে দেয় বাঁচাইয়া, সে অন্ন যখন কেহ কাড়ে, সে প্রাণে আঘাত দেয় সর্ব্বান্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে, নাহি জানি কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে, এদের জন্য " অন্য চাই, প্রাণ চাই চাই মুক্ত বায় চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ, উজ্জ্বল পরমায়ু সাহস বিস্তৃতি বক্ষপট৷" তার জন্য কবি আহ্বান জানান, এই দৈন মাঝারে কবি একবার নিয়ে এস স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি কবির মানব চেতনাই ধর্ম চেতনা শতকে শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মান ভার মানুষের নারায়নে তবুও করো না নমস্কার তবু নত করি আঁখি দেখিবারে পাও নাকি নেমেছ ধুলার তলে হীন পতিতের ভগবান৷ অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান৷ অথবা "নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে দেবতা নেই ঘরে তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে করছে চাষা চাষ পাথর ভেঙে কাটছে সেথায় পথ, খাটছে বারো মাস" তারি মতন শুচিবসন পড়ি আয়রে ধুলার পরে৷ একদিকে রাজশক্তির শাসন শোষন এবং ---- সর্ব্বস্ব শাস্ত্রের বন্ধন ও নিগ্রহে সমাজের বৃহত্তম মানব গোষ্ঠি বিধ্বস্ত৷ এর বিরুদ্ধে যারাই প্রতিবাদ জানাবে তাদের উপর নেমে আসবে রোষানল৷ ইশ্বরের প্রতি, মানব পুত্র যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় জীবন দিতে হয়েছিল৷ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি অমৃতের সুধা পান করেন৷ সে প্রক্রিয়া আজও শেষ হয়নি কারণ "সেদিন তাঁকে মেরে মেঁরে ছিল যারা ধর্ম মন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তারাই আজ নূতন জন্ম নিল দলে দলে তারাই আজ ধর্ম মান্দিরের বেদির সামনে থেকে
"দেবতার গ্রাস" ও "বিসর্জন" কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কিভাবে ধর্মীয় সংস্কারের বশবতী হয়ে মানুষ মানব সন্তানকে বিসর্জন দেয়৷ ধর্মের যুপকাষ্ঠে মানবতার বলিদান কবিকে আহত করে৷ তাই বেদনা হত কন্ঠে তিনি বলেন- " ধর্মের নামে মোহ এসে যারে ধরে অন্ধ সেজন মারে আর শুধু মরে" মানব মহিমার উপলব্ধি থেকে কবি নিজেকে লাঞ্ছিত মানুষের সাথে এক হয়ে বলেছেন " করি আমি ওদের দলে আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন দেবতার বন্দীশালায় আমার নৈবদ্য পৌছলনা" কবির মানবতা দেশ কাল পাত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি৷ তা বিশ্ব মানবতায় রূপান্তরিত হয়েছে৷ তিনি বলে ছিলেন " বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহার সেই খানে যোগ তোমার সাথে আমারো"৷ তিনি ছিলেন বিশ্ব কবি৷ তিনি মনে করেন "স্বজাতির সীমানার মধ্যে আপনাকে সংকীর্ণ ভাবে উপলব্ধি করাই" কোন জাতির গৌরব হতে পারে না৷ তাই কবির কাছে কোন দেশে যাওয়া শুধু মাত্র দেশ ভ্রমন নয় সে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাচীন সাহিত্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি আচার ব্যবহর নিরীক্ষন করা, ভারতের মর্মবানী তাদের কাছে পৌছে দেওয়া তাদের শিক্ষার সভ্যতার আলোকে ভারতকে আলোকিত করা৷ যার স্বরূপ আমরা দেখতে পাই সাগরিকা কবিতায়৷ 1930 সালে রাশিয়া ভ্রমন করার পর তাঁর মনে হয়েছিল রাশিয়ায় না এলে তাঁর আজীবন তীর্থ পরিক্রমা অসমাপ্ত থেকে যেত৷ রাশিয়াথেকে আমেরিকা যাওয়ার পথে তিনি যে চিঠি লিখেছিলেন তাতে বলেছেন" মানুষের সভ্যতার অখ্যাত, সকলের চেয়ে বেশী তাদের পরিশ্রম, সকলের চেয়ে বেশী তাদের সম্মান,তারা সভ্যতার পিলখুজ৷ মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাঁড়া দাঁড়িয়ে থাকে- উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গাদিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে৷ সেই শ্রমজীবি, কৃষিজীবি মানুষের সেখানে উন্নতি দেখে তিনি যেমন বিমোহিত হয়েছিলেন, তেমনি ব্যাথাতুর হয়েছিলেন ভারতের বৃহত্তম মানব সমাজের দুঃখ দুর্দশা দেখে৷ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবির লড়াই মানবাত্মার অবমাননার বিরুদ্ধে লড়াই- "এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে এল মানুষ ধরার দল গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে সভ্যের বর্বর লোভ নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা আবার সেই সময় পৃথিবীর অপর প্রান্তে বেজে উঠেছিল " সুন্দরের আরাধনা"
জালিয়ানাওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে তিনি নাইট উপাধি ত্যাগ করেন৷ তিনি বুঝেছিলেন সাম্রাজ্যবাদীরা শেষ কথা বলে না৷ কারণ তাদের " জ্যোতিষ্ক লোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন থাকিবেনা"৷ অথচ সত অত্যাচার লাঞ্ছনা সত্ত্বেও মানব সভ্যতার অগ্রগতি খেটে খাওয়া মানুষই অব্যাহত রাখবে৷ " রাজ ছত্র ভেঙে পড়ে, রনডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে"৷ অথচ "ওরা চির কাল টানে দাঁড় ধরে থাকে হাল ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে ওরা কাজ করে নগরে প্রান্তরে" কবি মনে করেন " মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাঁপ" মানবের নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করতে মানুষই এগিয়ে আসে৷ তারাই "ওই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে" ভাষা যোগায়৷ "শান্ত শতস্ক ভগ্ন বুকে" আশার সঞ্চার করে৷ সে বলবে "আমি ঢালির করুণা ধারা অমি ভাঙ্গির পাষান কারা"৷ সে সমস্ত দৈন্যের মাঝে শোনাবে "শান্তির ললিত বানী"৷ "রক্তকরবীর" নন্দিনী একাধারে ধ্বংসের মন্ত্র ও প্রাণ প্রবাহের বীজ বহন করে আনে৷ যক্ষপূরীতে স্বর্ণ চাষ করতে গিয়ে যে মানুষ পরিনত হয় নাম হীন সংখ্যায়, নিন্দনী, রঞ্জন, বিশু সেখানে সঞ্চার করে প্রাণের আবেস৷ যক্ষপূরীর অচলায়তনকে সে ভেঙে গুড়িয়ে ফেলতে চায়৷ শেষ পর্যন্ত রাজা নিজেও তাঁর ---- বন্ধনের মায়াজাল ভেদ করে বেড়িয়ে এসে মিশে যায় জনতার দলে৷ তিনি অমোঘ কন্ঠে ঘোষণা করেন, "ঐ মহামানব আসে" এই মহামানব কোন দিব্য পুরুষ নয়৷ এই মহামানব হচ্ছে অখন্ড মানব সত্তার৷ যা সমস্ত বাধা বিপত্তি দ্বন্দ্ব- সংশয়, আনন্দ-বেদনা, সুখ- দুঃখকে অতিক্রম করে,, আঘাত সংঘাতের মাঝে দাঁড়িয়ে পূর্ণতা লাভ করে৷ অপরিমেয় কল্যাণময় শক্তির প্রকাশ যে মানুষের মধ্যে তিনিই দেবতা৷ আর এই পৃথিবী হচ্ছে তার মহাতীর্থ৷ " আমি এসেছি এই ধরনীর মহাতীর্থে- এখানে সর্বদেশ৷ সর্ব জাতি ও সর্বকালের ইতিহাসের মহাকেন্দ্রে আছেন নর দেবতা, তরই বেদীমূলে নিভৃতে বসে আমার অহংকার, আমর ভেদ-বুদ্ধি ক্ষালন করবার দুঃসাধ্য চেষ্টায় আজও প্রবৃত্ত আছি৷" "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব" তবু তারই মাঝে থেকে কবি হৃদয়ের গভীর উপলব্ধি হতে ঘোষণা করেন মানবের জয়৷ " জয় জয় জয় রে মানব অভ্যুদয়" জয হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের৷
লেখিকা প্রাক্তণ শিক্ষিকা
|
|
|
|
|