মুখ্য পৃষ্ঠা > অন্যান্য বিষয় > ওয়েবদুনিয়ার বিশেষতা 08 > কবিপক্ষ
পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়ামিত্রকে পাঠানএই পৃষ্ঠা প্রিন্ট করুন
 
বিবি ও রবি
বরুণ চট্টোপাধ্যায়

রক্তের সম্পর্কের দিক থেকে অতি নিকট আত্মীয়ের মধ্যে যৌন সম্পর্ককে Incest বা অজাচার বলা হয়৷ পৃথিবীর প্রায় সমস্থ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই incest সম্পর্ক কোন না কোন taboo বা নিষেধাজ্ঞা প্রচলিত৷ কিন্তু এই নিষিদ্ধ সম্পর্কের কোন সর্বজনগ্রাহ্য সীমারেখা আজও তৈরি হয় নি৷ উত্তর ভারতে যে যে ধরনের সম্পর্ককে incest এর কোটায় ফেলা হয় দেখা যাবে দক্ষিণ ভারতে সেই সম্পর্কই বিবাহের পক্ষে উপযুক্ত৷ হিন্দু ও ইসলাম ধর্মেও incest ধারণা আলাদা৷ হিন্দুধর্মেই সম্ভবত incest এর সর্বাধিক উদাহরণ পাওয়া যায়৷ এই ধর্মে ভাই ও বোনের সম্পর্ক সবচেয়ে পবিত্র৷ অর্থাত যৌনতার সংস্রব বিহীন৷ অথচ ভাই ফোঁটার সময় বোন যে মন্ত্র পড়ে ভাইয়ের মাথায় ফোঁটা দেয় সেই মন্ত্রে, অবশ্য মন্ত্র না বলে একধরণের ব্রতকথাই বলা ভালো, যম ও যমুনার সম্পর্ককে অমর ও সুপবিত্র আদর্শ সম্পর্ক বলে স্বীকার করা হয়৷ অথচ যম ও য্মুনার মধ্যে যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল৷ অর্থাত incest বা অজাচার ঘটেছিল৷ ভারত বর্ষে প্রেমিক প্রেমিকা যুগলের icon রাধা ও কৃষ্ণের সম্পর্কও incest বা নিসিদ্ধ সম্পর্কের কোটায় পড়ে৷ রাধা একে কৃষ্ণের মামিমা আর বয়সে বড়৷ অথচ এই যুগলমূর্তিকে গোটা ভারতবর্ষে পুজো করা হয়৷ ভারতের সীমানা পেরিয়ে যদি প্রাচীন মিশরের দিকে তাকানো যায় দেখা যাবে ভাই-বোনই আদর্শ বিবাহের পাত্রপাত্রী৷ বরং ভাই যদি বোনকে এবং বোন যদি ভাইকে বিবাহ না করে অন্য কাউকে বিয়ে করে সেটাকেই ধরা হবে incest এর চূড়ান্ত বলে৷ প্রাচীন গ্রীসে মিশরেরই ইতিহাস আশ্রিত সফোক্লিশের বিখ্যাত নাটক 'রাজা অয়দি পাউস'এ অয়দি পাউসের সঙ্গে ঘটনা চক্রে মাতা ইয়োকাস্থের যৌন সম্পর্ক ঘটেছে, এমনকি অয়দি পাউসের মাতার গর্ভে সন্তানের জন্মও হয়েছে৷ নটকের একটি অংশে অয়দিপাউসের আতঙ্কিত প্রশ্নের উত্তরে ইয়োকাস্ত বলেছিলেন সমস্ত পুরুষই স্বপ্নে মাতার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়৷ স্বপ্ন বিশ্লেষনকে যে মনোবিজ্ঞানী প্রথম একটি বৈজ্ঞানিক ফর্মুলার আকার দেওয়ার প্রয়াস করেন সেই সিগমুন্ড ফ্রয়েড অয়দিপাউসের কাহিনী থেকে সূত্র পেয়ে ইদিপাস বা অয়দিপাউস-কমপ্লেক্স-এর ধারণা তৈরি করেন৷ এই কমপ্লেক্সের মূল কথা হল পুরুষ সন্তান পিতাকে তার যৌন-প্রতিদন্দী মনে করে এবং মাকে যৌন সঙ্গিনীরূপে কামনা করে৷

ইরাবতী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী৷ আমার এরকম ইঙ্গিত দেবার কোন অভিপ্রায় নেই যে রবীন্দ্রনাথের কোন রকম যৌন সম্পর্ক ছিল বা যৌন সম্পর্ক থাকার সম্ভবনা ছিল৷ কিন্তু জোড়াষাঁকো ঠাকুরবাড়ির মধ্যে বিরাট যৌথ পরিবারে প্রতিটি নারীপুরুষের সম্পর্কই যে স্বাভাবিক ছিল তা নয়৷ বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে নারীর ভালোবাসা তাঁর প্রধান প্রেরণা, জ্যোতিন্দ্রনাথের পত্নী, রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান কাদম্বরীদেবীর মৃত্যু আজ প্রর্যন্ত রহস্যাবৃত৷ তিনি ঠিক কি কারণে আত্মঘাতী হয়েছিলেন সে বিষয়ে বিস্তর মতভেদ আছে৷ এক শ্রেণীর গবেষক আজও খুঁজে বেড়ান রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীর কোন প্রত্যক্ষ যৌন সম্পর্ক ছিল কিনা৷ এই অনুসন্ধানটায় অবান্তর৷ প্রেম বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ শারীরিক সংযোগকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুললে সম্পর্কটা আরও অস্বচ্ছ হয়ে যায়৷ এখানে কাদম্বরীর কথা বিস্তারিত বলার কোন প্রয়োজন নেই৷ এ বিষয়ে আগ্রহী পাঠক যদি সদ্য প্রয়াত কবি অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্যের কবিমানসী গ্রন্থের দুটি খন্ড পড়ে দেখেন তাহলেই কাদম্বরীর সঙ্গে রবীন্দ্র নাথের সম্পর্কের বহূমাত্রিক দিকগুলির সন্ধান পাবেন৷ কাদম্বরীর আত্মহননের সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন চব্বিশ বছর৷ মৃত্যু কালে কাদম্বরীর বয়স প্রায় পঁচিশ, রবীন্দ্রনাথের থেকে বয়সে সামান্যই বড় ছিলেন তিনি৷ রবীন্দ্রনাথের বিবাহের মাত্র সাড়ে চার বছর পর কাদম্বরীর মৃত্যু হয়৷ এর মধ্যে কোন কার্যকারণের সন্দেহজনক গন্ধ না খুঁজে এইটুকু বলা যায় তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা কাদম্বরীর শূন্যতা প্রায় অশিক্ষিতা বালিকা মৃণালিনীর পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব ছিল৷ রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ট আত্মীয়জনের মধ্যে কৃষ্ণকৃপালী রবীন্দ্রনাথের যে জীবনী (Rabindranath Tagare: A Biography) লেখেন তাতে দ্বিদাহীন ভাষায় বলা হয়েছে '.........(his niece indira) aeems to have partially repcaced his deceased sister-in-law as his chief confidente" সদ্য প্রয়াত রবি জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল 'partially' শব্দটির জায়গায় 'fully' বসাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন৷ অর্থাত কাদম্বরীর মৃত্যুর শুন্যতা পূরণ করতে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরা(মেজ দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর একমাত্র কন্যা)৷ উক্তিটি দুঃসাহসিক এবং প্রকৃত সত্য প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দুঃসহস কৃষ্ণকৃপালীর ছিল বলে মনে হয়৷ কাদম্বরীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের মনসিক অবস্থার বর্ণনা ইন্দিরা দেবী দিয়েছেন তাঁর আত্মকথা 'স্মৃতিসম্পুটের' প্রথম খন্ডে৷

"তখন তো বিশেষ কিছু বুঝতুম না৷ তবে রবিকাকাকে খুব বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখতুম"৷

কাদম্বরীর মৃত্যুর সময় ইন্দিরাদেবীর বয়্স দশ বছরের কিছু বেশি৷ সে কালের একটি দশ বছরের মেয়ে, যার প্রাথমিক শিক্ষা শুরুই হয় বিলেতে, সে 'বিশেষ কিছু' বুঝব না কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ মাত্র সাড়ে তিন বছরে ইন্দিরা দেবী মা জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে বিদেশে চলে যান৷ রবীন্দ্রনাথ সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিলেতে পৌঁছান 1878 সলে 10ই অক্টোবর৷ তখন ইন্দিরার বয়স পাঁচ বছর৷ বিলেত থেকে সত্যেন্দ্রনাথ সপরিবারে দেশে ফেরার জন্য জাহাজে ওঠেন 1880 সালের ফেব্রয়ারী মাসে৷ রবীন্দ্র নাথ তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন৷ ইন্দিরাদেবী স্মৃতিকথায় লিখেছেন জাহাজে ফেরার সময় প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ের মধ্যে জাহাজের ক্যাপটেনকে টমাসমুচের 'আইরিসকেলোডি'র 'The Last Rose of Summer' গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন৷ এই মেয়ে দশ বছর বয়সে কিছু বুঝতনা মানা শক্ত৷ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাইঝি ইন্দিরাদেবীর রূপ মুগ্ধ ছিলেন তার শৈশব থেকেই৷ রূপমুগ্ধ করার মতো রূপ ও গুণমুগ্ধ করার মতো গুণ এ দুয়ের কোনটিরই কোন অভাব ছিল না ইন্দিরাদেবীর৷ বিশেষত শৈশব থেকেই এই ভাইজির সাহিত্যপ্রীতি ও সংগীতপ্রীতি রবীন্দ্রনাথকে অভিভূত করেছিল৷ ইন্দিরাদেবীর বয়স যখন তেরো এই সময় নিজের বয়স সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য "যৌবন হচ্ছে জীবনের সেই ঋতুপরিবর্তনের সময় যখন ফুল ও ফলের প্রচ্ছন্ন প্রেরণা নানা বর্ণে ও রূপে অকসাত্ বাহিরে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে৷ 'কড়ি ও কোমল' আমার সেই পরযৌবনের রচনা৷" তেরো বছরের ইন্দিরা ও পঁচিশ বছরের যুবক রবীন্দ্রনাথের হৃদয় বিনিময় প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই কাব্যে৷ বাংলাসাহিত্যের ঐতিহ্য 'কিশোরী'র প্রণয় মুগ্ধতা বিশেষ স্থান পেয়েছে৷ রবীন্দ্রনাথের প্রিয় কবি চন্দ্রিদাস তাঁর কবিতায় বলেছেন, 'কিশোরীর ভজন, কিশোরীর পূজন, কিশোরীর সাধন সার!' রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই 'কড়ি ও কোমলে'র মধ্যে দুটি ধারা আছে, একটি 'জীবনের পথে মৃত্যুর আবির্ভাব' আর একটি 'যৌবনের প্রবল রসোচ্ছাস'৷ জীবনের পথে মৃত্যুর আবির্ভাব যদি প্রধান প্রেরণা হন নতুন বৌঠান কাদম্বরীদেবী, কিশোরী ভাইঝি 'ইন্দিরাদেবী' 'যৌবনের রসোচ্ছাস' এর অন্যতম প্রেরণা৷ কৃষ্ণকপালীর অনুমানের তাত্পর্য হয়ত খনিকট স্পষ্ট হয়৷ কাদম্বরীর মৃত্যুর শূণ্যতা ইন্দিরা অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছিলেন তাঁর উচ্ছসিত কৈশোর দিয়ে৷ 'কড়ি ও কোমল' এর প্রমাণ স্পষ্ট৷ ইন্দিরাদেবী নিজে তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন:

"রবিকাকা আমাকে উদ্দেশ্য করে যেসব পত্র লিখেছিলেন কড়ি ও কোমলের প্রথম সংস্করণে(1293) সেগুলি বেরিয়েছিল৷ তার তিনটি এখনও কড়ি ও কোমলে ছাপা হয়৷ আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় আমার মনে হয় এই তিনটি কাব্যরত্ন বিশেষ, আর আমার সঙ্গে তার যোগ স্বরণ করে বিশেষ গৌরব অনুভব করি৷ আমার জন্মদিনে একটি সুন্দর পিয়ানোর মতো গড়নের দোয়াতদানি উপহার দিয়ে তার সঙ্গে যে কয়েক ছত্র লিখেছিলেন সেই তাঁর হাতের স্পর্শে উজ্জ্বল, এটিও কড়ি ও কোমলের প্রথম সংস্করণে ছিল-
"স্নেহ যদি কাছে রেখে যাওয়া যেত
চোখে যদি দেখা যেত রে
বাজারে জিনিস কিনে নিয়ে এসে
বল দেখি দিত কে তোরে৷..'..."

বোঝাই যায় দুজনের সম্পর্ক প্রগাড় হয়ে উঠেছে৷ ইন্দিরা দেবীর উদ্দেশ্যে রবীন্দ্র নাথের প্রথম কবিতা প্রভাতসংগীত এর 'স্নেহ উপহার কবিতাটির কয়েকটি অংশ বিচ্ছিন্ন ভাবে উদ্ধৃত করছি: শ্রীমতী ইন্দিরা:- প্রাণাবিকাসু বাবলা (ইন্দিরাদেবীর আদরের ডাকনাম, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া)
আয়রে বাছা কোলে বসে চা মোর মুখ পানে,
হাসিখুশী প্রাণ খালি তোর প্রভাব ডেকে আনে৷
আমায় দেখে আসিস ছুটে, আমায় বাসিস ভালো,
কোথা হতে পড়লি প্রাণে তুইরে উষার আলো৷'

কবি গুরুর উপরে বিশিষ্ট জনের লেখা দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন৷
1 | 2  >>  
অতিরিক্ত
রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর আধুনিক চিন্তা
রবীন্দ্র কবিতার খুঁটিনাটি- একান্তে ব্রততী
প্রার্থনা
মানব দরদী রবীন্দ্রনাথ
অজানা রবীন্দ্রসঙ্গীত...একান্তে সুভাষ চৌধুরী
স্মৃতির টুকরোগুলো...একান্তে আশ্রমকন্যা রমা চৌধুরী