কবিতাটির মধ্যে স্নেহের সুরই স্পষ্ট৷ মনে রাখা পরপর দশবছরের কম বয়সী বালিকা ইন্দিরাকে উদ্দেশ্য করে যখন এই 'স্নেহ' উপহার নিবেদন করা হচ্ছে তখনও কাদম্বরী জীবিত এবং রবীন্দ্রনাথের তখনও বিবাহ হয়নি৷ তাহলে 'জীবনের ধ্রুবতারা' কাদন্বরীর জীবনদশাতেই রবীন্দ্রনাথ বালিকা ইন্দিরার মধ্যে 'উষার আলো' দেখতে পেয়েছিলেন৷ এই 'স্নেহ-উপহার' কবিতাটির সমাপ্তি বিস্ময়কর!
"দূর করে ছাই, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম কত কি যে? কথাগুলো বেকচে যেন চোখের জল ভিজে ভিজে! রবিকাকা৷"
শুধুমাত্র স্নেহ-বাত্সল্যের কবিতা হলে তো চোখের জলের জোয়ার আসাঠিক স্বাভাবিক নয়! রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল এই সংসয়ের সমর্থনে বলেছেন: "দশ বছরেরও কম বয়সে(বৈশাখ 1290- তে প্রভাত সংগীত-এর প্রকাশকালে) একটি বালিকাকে এই গ্রন্থত্সর্গ বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে হয়৷" "দশ বছরের কম বয়সী ইন্দিরা যখন তেরো বছরের কিশোরী তখন 'কড়ি ও কোমলে' তাঁর উদ্দেশ্যে লেখা কবিতাগুলি(পত্রাকারে লেখা) স্বাভাবিক কারণেই সুর বদলে গেছে! 'কড়ি ও কোমলে'র 'মঙ্গলগীত' কবিতায় ইন্দিরা দেবীকে 'প্রাণাবিকাসু' সম্বোধন করে(এই সম্বোধন দশ বছরের বালিকা ইন্দিরাকেও করা হয়েছে) বলছেন:
"তোমার চরণে আমি মাগিবে মরণ লক্ষ্য হারা শতশত মত, যেদিকে ফিরাবে তুমি দুখানি নয়ন সেদিকে হেরিবে সবে পথ৷" - এই কবিতার অংশ অবলম্বনে কি বলা যায় না কাদম্বরীর মৃত্যুর পর ইন্দিরাই হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্র নাথের 'জীবনের ধ্রুবতারা'? এই কবিতায় শুধু ইন্দিরা রবীন্দ্রনাথের ধ্রুবতারা হয়ে ওঠেন নি, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে নিজেকেও ইন্দিরার জীবনের ধ্রুবতারা করে তুলেছেন৷: "আমার এ গান, মাগো, শুধু কি নিমেষে মিলাইবে হৃদয়ের কাছাকাছি এসে? ............. এ গান যেন রে হয় তোর দ্রুবতারা, অন্ধ কারে অনিমেষে নিশি করে সারা৷ তোমার মুখর' পরে জেগে থাকে স্নেহ ভরে, অকূলে নয়ন মেলি দেখায় কিনারা"
কাদম্বরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের 'জীবনের ধ্রুবতারা', রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরীর 'জীবনের ধ্রুবতারা' নন৷ কিন্তু ইন্দিরার ক্ষেত্রে উভয়ে উভয়ের ধ্রুবতারা৷ বয়সে অনেক কম নারীর প্রেম রবীন্দ্রনাথের প্রিয় কবি গেটে(Goetnc)র জীবনেও এসেছে বহুবার৷ রবীন্দ্রনাথ সয়ং তাঁর 'গেটে ও তাঁহার প্রণয়িনীগন' নামের একটি প্রবন্ধে বয়স্ক গেটের সঙ্গে শালিকা অ্যানসেল, এমিলিয়া এবং আরো অনেক নারীর প্রেমের কথা বলেছেন৷ তবে গেটের প্রেমিকারা কেউ গেটের অতি নিকট আত্মিয় ছিলেন না৷ কিন্তু ইরাবতী ও ইন্দিরা দুজনেই রবীন্দ্রনাথের অতি নিকট আত্মীয় বা First Cousin এর মধ্যে পড়েন৷ যাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক সামাজিক বিধি অনুযায়ী Incest বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের আওতায় পড়ে৷ এই Incest এর ধারনাটি কতদূর গ্রাহ্য এবং একে আমরা সামাজিক সংস্কারের কালিমায় কতটা কলুষিত করে তুলেছি তাবিবেচনার বিষয়৷ প্রেমের এক দেবতা Cupid তো অন্ধ৷ ইন্দিরাও তাঁর আত্মকথায় প্রেমকে অন্ধই বলেছেন৷ আসলে ইন্দিরার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক সাধারণ প্রেমের চেয়ে অনেক গভীর ছিল৷ আবার বলছি যৌনতা বা শারীরিক সম্পর্কের কথা এ প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক৷ রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ চিঠি পত্রগুলি লেখেন ইন্দিরা বা বিবিকে৷ এই পত্র সংকলনের নাম ছিন্নপত্রাবলী: ছিন্নপত্রাবলীর একটি চিঠিতে জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ইন্দীরাদেবীর সঙ্গে গেটের জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন(12ই আগষ্ট, 1894 এর শিয়ালদহ থেকে লেখা চিঠি৷ আর 1894 এর 7 অক্টোবরের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ অনেকটায় স্পষ্ট করেদিলেন ইন্দিরাদেবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক৷:
"আমি জানি [বব] তোকে আমি যেসব চিঠি লিখেছি তাতে আমার মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব যে রকম ব্যাক্ত হয়েছে এমন আমার আর কোন লেখায় হয় নি৷............. তোকে আমি যখন লিখি তখন একথা কখনও মনে উদয় হয় না যে, তুই আমার কোন কথা বুঝবি নে, কিম্বা ভুল বুঝবি, কিম্বা বিশ্বাস করবি নে, কিম্বা যেগুলো আমার পক্ষে গভীরতম সত্য সেগুলোকে তুই কেবলমাত্র সুরচিত কাব্য কথা বলে মনে করবি৷ সেই জন্যে আমি জেমনটি মনে ভাবি টিক সেই রকমটি অনায়াসে বলে যেতে পারি৷....... তুই আমাকে অনেকদিনথেকে জেনে আসছিস বলেই যে তোর কাছে আমার মনের ভাব ভালো ব্যক্ত হয় তা নয়; তোর এমন একটি অকৃত্রিম স্বভাব আছে, এমন একটি সহজ সত্যপ্রিয়তা আছে যে, সত্য আপনি তোর কাছে অতি সহজেই প্রকাশ হয়৷ সে তোর নিজের গুনে, যদি কোন লেখকের সব চেয়ে ভালো লেখা তার চিঠিতেই দেখা দেয় তাহলে এই বুঝতে হবে যে, যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে তারও একটি চিঠি লেখার ক্ষমতা আছে৷"
ইন্দিরাদেবীর প্রেম যদি রবীন্দ্র নাথের জীবনের গভীরতম সত্য উত্সারিত হয়, এবং সেই প্রেমকে যদি কেউ Incest এর কোটায় ফেলতে চান, তবে সেই নিষিদ্ধ সম্পর্কের জয় হোক-' আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী' - এতো কথার কথা নয়, লাখ কথার এক কথা৷
|