বরুণ চট্টোপাধ্যায়
বৈশাখ মানে গ্রীষ্ম দারুণ বৈশাখ শুরু হল বাঙ্গালির প্রিয় নতুন বছর, তিমির দুয়ার খোলো৷ সারা বছর বাঙ্গালির অপেক্ষা কবে আসবে বৈশাখ৷ চৈত্রর শেষে নীলষষ্ঠী, চৈত্রসংক্রান্তিতে শিবের গাজন৷ গাজন নৃত্যরত হবেন মৌনী তাপস শিব, উতলা নাচের আকস্মিক একটি পদক্ষেপ কেটে যাবে চৈত্রসংক্রান্তির পর একটি দিন৷ পূর্বদিগন্তে আঁধার বিলয় করে একমুখ আলো নিয়ে দুয়ারে এসে দাড়াবে পয়লা বৈশাখ৷
সেই কবে হূতাম লিখে গেছেন- "আজ বত্সরের শেষ দিন৷ যুবত্বকালের এক বছর গেল দেখে যুবক যুবতীরা বিষন্ন হলেন৷ হতভাগ্য কয়েদির নির্দিষ্ট কালের এক বত্সর কেটে গেল দেখে আহ্লাদের পরিসীমা রহিলনা৷ আজ বুড়োটি বিদায় নিলেন, কাল যুবকটি আমাদের উপর প্রভাত হবেন৷" 'যুবক'টি অর্থাত 'পয়লা বৈশাখ' 'আমাদের উপর প্রভাব হলেন৷ চৈত্র-সংক্রান্তি পেরিয়ে আমরা নিজের এক বছর বয়স বাড়িয়ে জীবনের একমাত্র অমোঘ নিয়তি মৃত্যুর দিকে এক বছর এগোলাম৷ পা দিলাম পয়লা বৈশাখে৷ নতুন রোদ্দুরে মুছে গেল বয়স বাড়ার অবসাদ৷ নতুন রাজা এলেন পুরতনকে বিদায় দিয়ে৷
ভাববার কথা এই যে, বাঙ্গালির এই বর্ষবরণ উত্সব এই বৈশাখে কেন, যখন ফুল্লরা তার বারোমাস্যায় বলছে 'বৈশাখ হইল আগো মরে বড় বিষ'? পয়লা বৈশাখের অধিষ্ঠাতা কি গ্রীক দেবতা Janus এর মতো কেউ যার এক মুখ অতীতের দিকে, অন্য মুখটি ভবিষ্যতের দিকে? যার নাম থেকে ইংরাজীর প্রথম মাস 'January'র উত্পত্তি? হিন্দু পুরাণ তো তেমন কথা বলছে না৷ পুরাণে রয়েছে গ্রীষ্মের অধিষ্ঠাতা দেবতা 'মরুত্গণ' নামে এক গণ 'দেবতা'৷ ঋক্ বেদে মরুত্গণের রূপ অবিকল রুদ্রের মতো৷ রুদ্র শিবের আর এক নাম৷ 'মরুত্গণের মাতা 'পৃষ্ঠতার' গতি ঝড়ের মতো৷ 'মরুত' শব্দটিতেও দ্যোতনা৷ ঝড়ের প্রবল গতিতে শিউড়ে ওঠা আকাশ থেকে নামে বৃষ্টি৷ এই ঝড়বৃষ্টিতে যাবতীয় ক্লেদ, ক্লৈব্য ব্যাধির উপশম৷ এই জন্য রুদ্র শিব মঙ্গলময়৷
কালের এই লীলার দিন পয়লা বৈশাখের ভোরে কালপুরুষ কিন্তু পূর্বদিগন্তে নেই, তাঁকে দেখা যায় সূর্যাস্তের সময়, পশ্চিম দিগন্তে৷ শুধু পুরাণ নয়, স্বাভাবিক কান্ডজ্ঞান দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় 'অগ্নহানায়' শব্দটির ব্যুত্পত্তিগত অর্থ 'প্রথম মাস'৷ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'মাসানাং মার্গশীর্ষোহ্হম' অর্থাত তিনিই প্রথম মাস, সমস্ত মাসের মধ্যে 'মার্গশীর্ষ'৷ অগ্রাহয়্ণ মাসকেই মাগশীর্ষ বলে গণ্য করা হত৷ ঋক্ বেদের সময় ভারতে দুটি বর্ষ ছিল- 'হিমবর্ষ' ও 'শরতবর্ষ'৷ পরে হেমন্ত বর্ষও স্বীকৃত হয়৷ হিম ঋতু থেকে বত্সরের আরম্ভ৷ 'হিম' শব্দটির অপর অর্থ বত্সর৷ হিমঋতু শুরু হত শরত্কাল দিয়ে৷ আমর কোষে দেখা যায় 'শরত' শব্দের অর্থ বত্সর৷ বৈদিক ঋকবেদের দুইটি প্রার্থনা৷ প্রথমটি 'আমরা যেন শত হিম হরিত থাকি৷' অপরটি 'আমরা যেন শত শরত জীবিত থাকি', অর্থাত 'শজায়ু হও' আঙ্গলিক আশীর্বাদটির মধ্যে 'হিম'ও 'শরত' প্রচ্ছন্ন আছে৷ শারদীয়া উতসবের মধ্যে প্রধান 'দূর্গোত্সব'৷ আজও যদি পাঁজি খুলি দেখা যাবে 'বিজয়া দশমী' তে শরত্কালের শুরুতে এবং দুর্গা-দশমী সেদিন পাপস্বরূপ মহিষাসুরকেই বধ করেছিলেন বলে দিনটি বিজয়োত্সব৷ দুর্গাপূজায় নতুন জামা-কাপড়, নব পত্রিকায় সাজানো মন্ডপের মধ্যেই, আড়ম্বরে আনন্দে মেতে ওঠার মধ্যেই নববর্ষের আদিরূপ প্রচ্ছন্ন৷ শাস্ত্রমতে বিজয়াদশমীই বত্সরের প্রথম দিন৷ 'দশেরা' বা 'দশরা' উত্সবের মূল কথা নববর্ষে রবির প্রথম উদয়৷
ব্যাসদেবের কালের অনেক পরে, আজ থেকে প্রায় 1700 বছর আগে শকাব্দে(319 খ্রিষ্টাব্দে) পয়লা বৈশাখে সূত্রপাত৷ তার আগে পর্যন্ত 'বিজয়াদশমী'-ই নববর্ষে বলে গণ্য হত৷ কিন্তু, শাস্ত্রীয় ব্যাসকূটে কোনকালে মানুষের আনন্দ ছিল না, আজও নেই৷ শাস্ত্র খুঁটে পয়লা বৈশাখে নববর্ষের মাহাত্ম্যকে মলিন করা নির্বুদ্ধিতা৷ এই দিনতির সঙ্গেই আমাদের নববর্ষ যাপনের অভ্যাস, স্বপ্ন, সাধ নিবিড় ভাবে মিলেছে৷ বিজয়াদশমীকে তো বাঙ্গালি স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছেই৷ অকালবোধনের উত্সব নববর্ষের সকালকে গিল খাবে কেন? পয়লা বৈশাখে নববর্ষ বরণ তো শাস্ত্রমতের বাইরে এক বাড়তি পাওনা৷ এই বাড়তি বা surplus-এর মধ্যেই মানুষের আনন্দ৷ বাঙ্গালি উত্সবমাত্রাকেই আশ্রয় করে বেঁচে থাকার ইচ্ছা ও আনন্দ বাড়িয়ে দেয়৷ শাস্ত্রমতকে শিরোধার্য করেও এই ফাউ উত্সবটিকে নববর্ষ বলে স্বীকার করে পয়লা বৈশাখে নব আনন্দে না জেগে ওঠাই নির্বোধের কাজ হবে৷ শাস্ত্রমতে যাই হোক থাক, পয়লা বৈশাখ আমাদের হৃদয়ের নববর্ষ৷ বাঙ্গালির সহস্র হৃদয়ে সর্বজনের সহস্রাধিক হৃদয় মিশে যেতে থাক পয়লা বৈশাখ৷ গ্রীষ্মের খরতাপকে উপেক্ষা করে অনন্ত আনন্দজাহ্ণবীর দিকে এগিয়ে যাক হিরণ-রোদে উজ্জ্বল পয়লাবৈশাখের প্রভাত ফেরী৷
*তথ্য স্বীকৃতিঃ পূজা-পার্বণ৷ শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি৷
লেখক অধ্যাপক এবং চিত্র পত্রিচালক৷
|