সে দিন সোনাইয়ের স্কুল ছুটি ছিল৷ কারণ সেদিন ছিল 26শে জানুয়ারী৷ ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস৷ খুব স্বাভাবিক ভাবেই সমস্ত স্কুল, কলেজ, অফিস সবই বন্ধ৷ কিন্তু ছুটির দিন থাকলেও প্রকৃত অর্থে ছুটি পায়নি ঐ ক্লাস থ্রি-এর ছাত্রটি৷ ইংরাজীর শিক্ষক বেরুতে না, বেরুতেই আমি হাজির৷ আমি সোনাইয়ের অঙ্কের শিক্ষক৷
জানুয়ারী মাস ছুটির দিনে সোনাইয়ের আশেপাশের প্রায় সব বাচ্চাগুলো বাবা-মায়ের সঙ্গে পিকনিকে গেছে বা ঘুরতে গেছে৷ তাই আমার ছাত্রের মনটা সেদিন একটু চঞ্চলই ছিল৷ কিন্তু উপায় কি? মাষ্টার এসেছেন, অংক তো করতেই হবে৷ তা না হলে জীবন তো আর এগোবে না৷ এই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে কম্পিউটার জানতে হবে৷ খেলায় পারদর্শী হতে হবে৷ না হলে বাবা-মার আর সমাজে মুখ দেখানোর জো থাকবে না৷ একটি মাত্র ছেলেকে সব বিষয়ে পারদর্শী না হলে স্ট্যাটাসটাই বা মেনটেন হয় কি করে৷ আর স্যাটাস ঠিক রাখতে গিয়ে বাচ্চাটির হাল কলুর বলদের থেকেও অধম হয়ে উঠেছে৷
অঙ্ক করাতে করাতে চোখে পড়ল লাল ছাপ৷ মিষ্টি গোলগাল দুধে-আলতা মুখে খুব তীক্ষ্ণভাবে ভেসে উঠেছে৷ জিঞ্জাসা করতেই খুব নীচু স্বরে জবাব দিল সকালে ঘুরতে যেতে যাওয়ার জন্য মা ওকে মেরেছে৷ মনটা খুব খারাপ হয় গেল৷ কিন্তু উপায় কি? বেকার ছেলে প্রতিবাদ করলে যদি 200 টাকা হাতছাড়া হয়ে যায়৷ তাই চুপ করে থাকতে হল৷ অংক বন্ধ করে দিয়ে সোনাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে লাগলাম৷ কারণ সেই দিনে সোনাইকে পড়া থেকে মুক্তি দেওয়াটা ভালো হবে বলে আমার মনে হয়েছিল৷
এরপর গল্প করতে করতেই সোনাই প্রশ্ন করে বসল৷ স্যার ছোটোদের জন্য কোন আইন নেই ? শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম৷ তাই তাকে প্রশ্ন করলাম কেন? সে বলে উঠল গতকাল স্কুলের এক স্যার নাকি তাদের বলেছেন, দেশের মানুষেরা যাতে ভালোভাবে ও আনন্দে থাকতে পারে তার জন্য নাকি 26 শে জানুয়ারী কিছু আইন লেখা হয়েছিল৷ তখন বুঝতে পারলাম, তার এই প্রশ্ন সামান্যতম ঞ্জানের উপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে থাকলেও গভীরতা খুবই বেশী৷ আমি আবার তাকে প্রশ্ন করলাম এই আইন হলে কি করলাম, আইন চালু হলে কি করতে? সাত আট বছরের ছেলেটি একটি বাক্যের মধ্যে তার সমস্ত আবদার বলে ফেলল- " খেলতাম, ছুটির দিনে ঘুরতে যেতাম, ছবি আঁকতাম, কার্টুন দেখতাম, দোলনায় চাপতাম৷ আর কত কি?
তার উত্তর শুনে আমি হতবাক৷সোনাইকে ছুটি দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম৷ পথ চলতে চলতে ভাবতে লাগলাম এই নিষ্পাপ শিশুগুলোর উপর কেন এত অত্যাচার? সত্যিই কি সোনাইদের জন্য কোন আইন কোনদিন হবে? যাতে ওরাও আদি অনন্ত নিয়মগুলো থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দে দিন কাটাতে পারে৷ সে প্রশ্ন আমার কাছে প্রশ্নই রয়ে গেল৷ কারণ গ ত দুবছর ধরে ছাত্র পড়াতে গিয়ে আমি দেখেছি বাবা-মায়ের আব্দার মেটানোর একমাত্র মেশিন হয়ে উঠেছে এই স্কুল পড়ুয়ারা৷ কারণ এই খোকলা সমাজের খোকলা আভিজাত্যকে বজায় রাখতে গিয়ে বাবা-মায়েরা সন্তান দের সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে পন্ডিত করার লক্ষ্যে মননিবেষ করেছে৷ তাতে আমার মতন বেকার যুবকেরা কি আর করার আছে?
কেননা আমাদের মত যারা বিভিন্ন পেশাতে নিযুক্ত তারা তো মনিবের চাকর৷ সংবিধানে কাজের অধিকার স্বীকৃত হলেও পেশা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা চলে তার কি কোন সুরাহা হবে কি৷ এখানে যেন সোনাই আর আমরা কোথাও যেন এক হয়ে যাই৷ তাই না?
|