শিউলি বাজপেয়ী
শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত৷ আজ যে চারাগাছ , কাল সে মহীরুহে পরিনত হবে৷ কিন্তু সেই ভবিষ্যত বা মহীরুহের গঠনে যে যত্ন বা পরিচর্যার প্রয়োজন, তাতে আজকাল এত ফাঁকি চোখে পড়ে যে মনে বড় কষ্ট পাই৷ এই ফাঁক খুব সযত্নে সময় থাকতেই যদি ভরাট না করা যায় তবে ভবিষ্যত প্রজন্ম যে সম্পূর্ন "মানুষ" হয়ে উঠতে পারবে না তা সংশয়ের অপেক্ষা রাখে না৷ আর তার জন্যে আমরাই সর্বতোভাবে দায়ী থাকব৷ তাই দেরী হলেও এখন থেকেই শুরু করা যাক৷
কিন্তু কেন এমন হল? এপ্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি৷ স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রেও আর্থিক বৈষম্য কখনও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি৷ বাবা মায়ের শাসন কোন রকমেই শৃঙ্খল পড়ায় নি সন্তানের পায়ে৷ হ্যাঁ, তবে এত ভালর মধ্যেও যা অনস্বীকার্য তা ছিল সন্তানের পেশা নির্ধারনের ক্ষেত্রে গুরুজনের উদাসীনতা৷ ধরা বাঁধা পথেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই নির্ধারিত থাকত তাদের জন্য৷ আমাদেরও নিজের পছন্দ বা অপছন্দ বোঝাবার মতন ক্ষমতা ছিল না৷ তাই বহু জায়গাতেই নিজের পছন্দ মতন কাজ বেছে নেওয়া আর হত না৷
তবে তাতেও জীবনে যে একটা থেমে থাকে নি তার জন্যে অর্থনৈতিক অবস্থানও বেশ একটা বড় কারণ৷ মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ প্রখর থাকলেও আর্থিক স্বচ্ছলতা সে ভাবে ছিল না৷ বিশ্বায়ন শুরু হয়নি তাই হাতছানিও কম ছিল৷ উচ্চবিত্ত সমাজের টাকার লোভ খুব একটা পাগল করে তুলতে পারেনি মধ্যবিত্তকে৷ আর তাই বিজ্ঞাণ শাখার যেন তেন প্রকারণে ভর্তি হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল না হয়েও বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীত শিল্পী, চিত্র শিল্পীর সমাবেশ দেখেছি৷ আর আমাদের চোখের সামনে আদর্শেরও অভাব ছিল না৷ উনিশ শতকের শেষে বা বিশ শতকের শুরুতেই তো পেয়েই সেই আদর্শবাদ মানুষের৷ তাঁদের জীবন, আদর্শই আমাদের চলার পথে উদ্ধুদ্ধ করেছিল৷
তবে এখন কেন এমন হল? কেন এখন কোন শিশুর মধ্যে শৈশব খুঁজে পাওয়া যায় না? কেন এত অস্থিরতা? এত হানাহানি? এসব নিয়ে ভাববার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছে৷ পুরোনোকে আঁকড়ে থাকা কোন কাজের কথা নয়, তেমনি অতীত বা শেকড় ভুলে ওপর থেকে শুধুই জল বা সার দিয়ে পরিচর্চা করলেও খুব ভাল 'ফল' কখনও পাওয়া যায় না৷
বর্তমান সময়ের অর্থনীতির বিরাট প্রভাব প্রত্যেকটি পরিবারেই পড়েছে৷ মূল্যবৃদ্ধির দরুণ উপার্জন বাড়াতে আজ সবাই মরিয়া৷ বিশ্বায়নের প্রভাবে এবং দূরদর্শনের দৌলতে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্য সামগ্রীর চকচকে মোড়ক প্রতিনিয়ত আমাদের আর্কষণ করে৷ আর তাই টাকা চাই... আরও, আরও টাকা৷ আর কে না জানে যে সবসময়েই প্রয়োজনের তাগিদে নীতির কথা শিকেয় তোলা থেকে যায়৷ কী ভাবে টাকা আসছে, তার থেকেও বড় হয়ে ওঠে কত টাকা আসল৷ রাজনীতিবিদদের বিরাট পুকুর চুরির কাছে সাধারণ মানুষের ছিচকে চুরি তো নগণ্য৷ আর তাই চুরির সঙ্গে জড়িত মিথ্যাচার 'সদা সত্য কথা বলিবে' আজও প্রহসন মাত্র৷ আর তাই আমরা মা, ঠাকুমা, দিদি, বোন শিশুদের কাছে আদর্শ হয়ে উঠতে পারি নি৷
যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় বাবা, মা ও সন্তান(একটি বা দুটি) নিয়ে এখন সংসার৷ দাদু, ঠাকুমা বা দিদিমার আদর শিশুদের বছরে একবার জোটে বা কখনও হয়তো জোটেই না৷ বেশীর ভাগ সংসারে বাবা-মা দুজনেই চাকুরীজীবী তাই সন্তান মানুষ করার দায়ভার 'আয়া'- এর উপর বর্তায়৷ একটু বড় হলেই বেশ দূরের কোনও নামকরা স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা৷ দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ী ফিরেই 'হোম ওয়ার্ক' য়ের বোঝা৷ ছুটির দিনেও গান,আঁকা, সাঁতার৷ ছেলে হলে ক্রিকেট বা টেনিস খেলার ক্লাস৷ বাড়ী ফিরে একটু কার্টুন নেটওয়ার্ক৷ গান-নাচ শেখা৷ 2-3 বছর হলেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নাম দেওয়ার হিড়িক৷ জিততে পারলেই গাড়ী, টাকা, বিদেশ যাওয়া৷ স্কুল শেষে বিজ্ঞান শাখায় পড়া- ভর্তির পরীক্ষা- ইঞ্জিনিয়ার বা অগ্যতা ডাক্তার- ক্যাট পরীক্ষা- ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রী- ব্যস৷ আর কে পায়৷ বিয়ের বাজারে দাম চড়তে থাকল৷ ছেলে হলে বিশাল পণ৷ আর মেয়ে হলে ভালো (মোটা মাইনের) পাত্র৷ এই হল ছক৷ একি মানুষ গড়ার কারখানায় ফেলে সন্তানকে 'মানুষ' করার বৃথা প্রচেষ্টা নয়৷
এ ব্যবস্থার আশু পরিবর্তন প্রতি পদক্ষেপে উপলদ্ধি করছি৷ এ ভাবে কোন মানুষ, জাতি, দেশ গড়ে উঠতে পারে না৷ টাকার নিরিখে মানুষের মনুষ্যত্বের বিচার বেশী দিন চলতে পারে না৷ "এখানকার ছেলে-মেয়েরা একেবারে অধঃপতনে যাচ্ছে" - এই দোষারোপ বন্ধ করে সত্যিকারের 'মানুষ' গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাবা-মা এবং সমস্ত গুরুজনদের চারিত্রিক সংশোধন সবিশেষ প্রয়োজন৷ নিজের আচড়ণে, চরিত্রে বা জীবিকায় সত্যতা না থাকলে আমার সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার কোন অধিকারই আমার থাকতে পারে না৷ এ ব্যাপারে মায়েদের বেশী করে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে৷ আত্মপুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্যে বেশী সময় দেওয়া কি খুব কঠিন৷? প্রতিটি শিশুর গ্রহণ সঙ্গে বেড়ে উঠতে সাহায্য তো আমরা করতেই পারি৷ অর্থ যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ায় আবার অনর্থও ডেকে আনে৷ তাই মায়েদের শিশুকে(ছেলে অথবা মেয়ে) সময় দেওয়া চাই৷ সময়ের বদলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে জিনিষ কিনে ঘুষ দেওয়া নয়৷ আমরা মানে গুরুজনেরা চলনে বলনে রুচিশীল হলেই সন্তান সুস্থ রুচির পরিচয় দেবে৷
মোটের উপর সব কিছুতেই সময় দেওয়া চাই-ই চাই৷ ফাঁকি দিয়ে যেমন কোনও বড় কাজ উদ্ধার করা হয় না৷ তেমনি পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই৷ আর তাই যে নারী দিবস নিয়ে এত আলোচনার ঝড় তা তখনই সফল হবে যখন আদর্শবান মানুষের যোগান বাড়বে সমাজে৷ যারা সমাজের রূপান্তর ঘটিয়ে সামাজিক ঐতিহ্যকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ তবেই সফল হবে সকল সামাজিক সম্পর্ক৷
লেখিকা বাণী ভারতী স্কুলের প্রাক্তণ শিক্ষিকা
|