সুমন বিশ্বাস, প্রতিনিধি, কলকাতা
অনেক মহিলাই এখন প্লেনের পাইলট৷ স্কুল কলেজের ফ্যাকাল্টিদের মধ্যে এখন প্রায় সমান সমান নারী ও পুরুষ৷ এছাড়া খেলাধুলা থেকে মহাকাশে যাত্রা কোন কিছুতেই নারীরা পিছিয়ে নেই৷ নারীরা এখন নিজের পায়ে দাড়াতে জানে৷ কারুর উপর নির্ভর করে থাকতে তারা এখন নারাজ৷ তাই সর্বত্রই নারীর জয়ধ্বনি৷ তাই এই রকম এক উন্নয়ন মুখর নারীজাতির জন্য নারী দিবস যতার্থই যুক্তিযুক্ত৷
এই আলোর রসনাই থেকে অন্ধকারে ঢুকলে এই নারীজাতির নারীর চিত্রটা কিরকম যেন গোলমেলে হয়ে যায়৷ অন্ধকারের চিত্র মানে বিলকিস বানু, মনোরমা থাংজাম৷ এরাও এই নারীদেরই একজন৷ কিন্তু এরা আলো থেকে আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে৷ আর এই আলো আঁধারির মঞ্চ গঠনের পিছনে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ৷ হ্যাঁ যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিলকিস বানু ও মনোরমা থাংজামকে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল সেই সমাজ৷ শুধু মনোরমা বা বিলকিস নয় এই সমাজে প্রতিনিয়ত মানসিক ভাবে বা শারিরীক ভাবে অত্যাচার করা হছে বহু মহিলাকে৷ এর মধ্যে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মহিলারা হয়ত কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে পেরেছে৷ কিন্তু সমাজের একেবারে নীচু স্তরের মহিলাদের প্রকৃত অবস্থানটা কোথায়? তারা কি জানে এই সমাজ নারীদিবস পালন করে থাকে?
ঝর্ণা মাইতি৷ বাড়ি দমদমের গাঙ্গুলী পাড়ায়৷ পেশা কচুরি বিক্রি করা৷ স্বামী নেই৷ তাই পেটের দায়ে তাকে এই কাজ করতে হয়৷ নইলে সংসার চলবে না৷ তার ছেলে মেয়েকে বড় করতে পারবে না৷ তাই ঘর এবং বাহির দুই সামাল দিয়ে চলেছেন৷ কিন্তু সমস্যা অনেক৷ অর্থের সমস্যাতো রয়েইছে তার থেকে বড় সমাস্যা অপমানের, মানসিক অত্যাচারের, বঞ্চনার৷ ঝর্না মাইতির কাছে নারী দিবসের কথা তুলতেই জিঞ্জেসা করে উঠল "সেটা আবার কোন দিন"? নারী দিবস সম্পর্কে বলার পর সে বলে উঠল এই দিন পালন করে কি লাভ৷ কারণ প্রতিনিয়ত তার উপর বা তার মতন নারীদের উপর একাংশ পুরুষদের প্রতিনিয়ত অত্যাচার চলে৷ বাজে ইঙ্গিতের সম্মুখীন হতে হয়৷ গালাগাল শুনতে হয় ছোট মানুষ বলে৷ তাই তার কাছে এই নারী দিবস মূল্যহীন৷ কারণ পুরুষতান্ত্রীক সমাজে নারী হিসাবে সে কোনদিনই সন্মান পাই নি৷
প্রায় পঁচিশ বছর বয়সী মালতি সর্দারকে শিয়ালদাহর আপ বা ডাউন ট্রেনে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে লজেন্স বিক্রি করতে প্রায় দেখা যায়৷ কিছুদূর পড়াশোনা করেছে তাই সে এখন সেলস গার্ল৷ নারী দিবস কথাটা সে শুনেছে৷ কিন্তু কবে এই দিনটি উদযাপন করা হয় সেটা অবশ্য সে জানে না৷ আর জানলেও তার কাছে এই দিবস অর্থহীনই থাকত৷ কারণ পুরুষতান্ত্রীক সমাজ তাকে বার বার আঘাত করে আসছে বলে সে জানায়৷ প্রথমে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন সেটা তার জীবনে একটা বড় আঘাত৷ আর তার পর ট্রেনে, রাস্তাঘাটে এই পুরুষ সমাজের লালায়িত দৃষ্টিতো তার উপর লেগেই রয়েছে৷ তবে সবাইকে দায়ী করেন নি তিনি৷ কিছু পুরুষমানুষ তার দূর্বলতার যে সুযোগ নিতে চায় সে কথা সে স্বীকার করে৷ ইতিমধ্যেই বহুবার তাকে অপমান করা হয়েছে বলে সে জানায়৷ কিন্তু সে নিরুপায় তাই তার করার কিছু নেই৷ তাই অবশেষে তিনি জানিয়েছেন সারা জীবন হয়ত তাকে এই অপমান সহে নিয়েই এই সমাজে বেঁচে থাকতে হবে৷
|