দেবারতি দাস, অধ্যাপিকা
সমগ্র বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নারী ক্ষমতায়নের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরা বেশ কঠিন কাজ৷ তাই এই প্রবন্ধের আলোচনা ভারতে নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেই সীমিত রাখা হয়েছে৷ এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য দুটি দিকে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে৷ প্রথমত নারী ক্ষমতায়নে ভারতীয় রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দ্বিতীয়ত তৃণমূল স্তরে উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে নারী ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা৷
প্রথম প্রসঙ্গটি আলোচলা করলে দেখা যায় যে, আপাত দৃষ্টিতে ভারতীয় রাষ্ট্র নারী ক্ষমতায়নকে সুনিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে নারী অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে৷ সংবিধানে জেন্ডারগত বৈষম্যকে দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে৷ যেমন সংবিধানের 14 নং ধারায় নারী পুরুষ ভেদে আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ও আইনের দ্বারা সমভাবে সংরক্ষণের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে৷ 15(3) ধারা, নারী কল্যাণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দিয়েছে৷ 42 ধারায় রাষ্ট্রকে মাতৃত্বকালীন সুযোগ সুবিধা এবং কাজের মানবিক ও ন্যায্য অবস্থা সুনিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ 51 (ক) ও (গ) ধারায় বলা হয়েছে নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্য হল নারীদের মর্যাদা হানিকর কোন আচরন থেকে বিরত থাকা৷এছাড়াও সংবিধানের 73 তম ও 74 তম সংশোধনীর (1993) মাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ানকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে৷ 243 তম ধারা অনুসারে প্রত্যেক পঞ্চায়েত ও পুর সভায় নারীদের জন্য 33 সতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে৷
এই সব সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছাড়াও নারীদের জন্য কিছু বিশেষ আইন বিভিন্ন সময় প্রণয়ন করা হয়েছে, তাদের অধিঅকারগুলি সুরক্ষা করার স্বার্থে এবং সামাজিক বৈষম্য, হিংসার হাত থেকে তাদের মুক্তি দেবার স্বার্থে৷ যেমন- Dowry Prohibition Act(1961), Immortal Traffic Prevention Act(1986), Indecent Representation of women(Prohibition)Act(1987),Commission of Sati(Prevention)Act(1987), National Commission for Woman Act(1990), Prenatal Diagnostic Techniques(Relegation & Prevention of Misuse) Act(1994),Protection from Domestic Violence Act(2005) প্রভৃতি৷ এছাড়া 2001 সালে নারী ক্ষমতায়নের জন্য জাতীয় নীতি গ্রহন করা হয়৷ নবম পরিকল্পনা (1997-2002) নারী ক্ষমতায়নের জন্য গৃহীত জাতীয় নীতি এবং নারী অধিকারের মূল্যায়ন করার জন্য গৃহীত Gendre Development Index (GDI) কে স্বীকৃতি জানায়৷ সর্বপ্রথম নবাম পরিকল্পনাতেই নারী সম্পর্কিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে "উন্নয়ন" এর পরিবর্তে " ক্ষমতায়ন " এর প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷ 1992 সালে National Commission For Women গঠিত হয়৷ 1990 সালের National commission for Women Act অনুসারে৷ এই জাতীয় নারী কমিশন বহুমুখী কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে হিংসা প্রয়োগের সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করেছে৷ এই কমিশন নারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর চেষ্টা করেছে৷ তাদের অভাব অভিযোগ দূর করার জন্য আইনী সহায়তা প্রদান করেছে এবং 2008 সালের মার্চ মাস থেকে কার্যকরী পারিবারিক মহিলা লোক আদালত গঠনের মাধ্যমে নারীদের জন্য দ্রুত সুবিচার প্রদানের ব্যবস্থা করেছে৷ এভাবে ভারতীয় রাষ্ট্র নীতি পরিকাঠামোর মধ্যে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে নারী ক্ষমতায়নকে সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে৷ কিন্তু নিছক আইনী ব্যবস্থা নারী ক্ষমতায়নকে সূচিত করতে পারে না৷ তাছাড়া অপর্না মহান্ত দেখিয়েছেন যে, ভারতীয় রাষ্ট্র এবং পিতৃতন্ত্রের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ বজায় আছে৷ তিনি বলেছেন সাবেকি উপায়ে নারী শোষন এবং জাতি ব্যবস্থার মাধ্যমে যে সামাজিক অন্যায় সাধন করা হয় তার কোন নৈতিক দায়িত্ব রাষ্ট্র স্বীকার করে না৷এছাড়া পিতৃ তান্ত্রিক সমাজের মধ্যে অন্তর্নিহিত সামাজিক শোষনের বৃহত্তর বিষয়গুলিকে রাষ্ট্র উপেক্ষা করে৷ তার মতে, গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ন হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় রাষ্ট্র একটি একক দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে৷ এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাবেকি স্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগকেই প্রমানিত করে৷
নারী ক্ষমতায়নের ভারতীয় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারনেই দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি অর্থাত তৃণমূল স্তরে আন্দোলন সংগঠনের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি বিশেষ অর্থবহ হয়ে উঠে৷ ভারতে স্বাধীন নারী গোষ্ঠী ও সংগঠন গুলির নেতৃত্বে তৃণমূল স্তরে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে৷ আমরা জানি যে, ভারতে নারী আন্দোলনের জন্ম স্বাধীনতা সংগ্রামের গর্ভে৷ All India Women Congress (AIWC) সর্বপ্রথম সারা ভারত নারী সংগঠন৷ আবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে National Federation of India সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন্ করেছিল৷ এছাড়া উত্তরাখন্ডের টিপকো আন্দোলন বা বৃক্ষ সংরক্ষন আন্দোলন সংগ্রামী রুপ ধারন করে বৃহত সংখ্যায় গ্রামীন মহিলাদের অংশগ্রহনের ফলে৷ এই গ্রামীন মহিলারাই প্রথম উন্নয়ন বিতর্কে জেন্ডার্ ইস্যুটি তুলে ধরে৷ পাহাড়ী অঞ্চলে বৃহত অংশে গাছ কেটে নেওয়ার ফলে জ্বালানী,জল, কাঠ প্রভৃতি ব্যবহারের অধিকার চলে যাওয়ায় তারা পরিবেশের ঠিকাদার, বনকর্মীদের বিরুদ্ধে যারা রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিল৷ এই ঘটনা ছাড়াও এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে ভূমি পুনর্বন্টনের ক্ষেত্রে নারীরা সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে৷বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন নারী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে৷ যেমন Self Employed Women's Association, All India Women's Conference, Working Women's Forum|
সমগ্র আলোচনা থেকে বলা যায় যে, রাষ্ট্র বাইরে থেকে প্রচেষ্টা চালালেও প্রয়োজন হল নারীদের মধ্যে থেকে সচেতনতার উন্মেষ৷ নারীরাই রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারে আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার সুষম বন্টন করতে৷ নারী সচেতনতা ও স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগই নারী ক্ষমতায়নের যথার্থ পথ৷
|