দেবারতি দাস, অধ্যাপিকা
নারীর ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কমূলক বিষয়৷ নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে৷ নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব অবস্থাকে উপলদ্ধি করার জন্য প্রথমে জরুরি হল এই ধারণাটি সম্পর্কে যে বিভিন্ন তাত্ত্বিক অবস্থানগুলো আছে তা আলোচনা করা৷ সাধারণত, ক্ষমতা বলতে বোঝায় বিভিন্ন অধিকার ভোগ করার স্বাধীনতা ও ক্ষমতা৷ ক্ষমতায়নকে দেখা হয়, ক্ষমতার পুনবর্ন্টনের মাধ্যমে বিদ্যমান অসম ক্ষমতার সম্পর্ককে পরিবর্তন করার উপায় হিসেবে৷এই প্রসঙ্গটি আলোচনা করার জন্য প্রয়োজন হল পুরুষ-নারী সম্পর্কে ক্ষমতার ঐতিহাসিক ও সামাজিক ব্যবহারের বিষয়টি পর্যালোচনা করা৷
মিলার এবং কিউমিস(Miller,Cummis,1992) দেখিয়েছেন, অতীতে পুরুষদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ক্ষমতার তত্ত্বায়ন করা হয়েছে৷ যেমন- মনস্তত্ত্ববিদ্যাতে, ক্ষমতাকে সংগ্রাম ও অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের উপায় হিসাবে দেখা হয়েছে৷ সমাজতত্ত্বে, ম্যাক্স ওয়েবার ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবেঃ- " chance of man or a number of man to realize their will in a communal action even against the resistance of others who are not participating in the action." ফুকো দেহের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে এক ক্ষমতার তত্ত্ব উপস্থাপিত করেছিলেন, যা নারী শোষণের প্রশ্নটি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে নারীবাদীদের সাহয্য করে থাকে৷ এই ব্যাখ্যাগুলো ক্ষমতার কাঠামোগত স্তরবিন্যাসের উপর গুরুত্ব দেয়৷
অন্যদিকে ক্ষমতাকে কার্যগত দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছেন লিপস, হ্যাবারমাস, ল্যানডেস, ইয়েটম্যান প্রমুখ তাত্ত্বিক ও গবেষকগণ৷ লিপস ক্ষমতার জেন্ডার তত্ত্বকে সমর্থন করে বলেছেন যে, নারী ও পুরুষ তাদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন উপায় অবলম্বণ করে থাকেন৷ নারীরা মূলত দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে গোপন কৌশল অবলম্বণ করে, কারণ বৈধ ক্ষমতার অভাব আছে এবং সম্পদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্বল্প৷ হ্যাবারমাস গণ পরিসরের ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, গণ পরিষদ এখনও পর্যন্ত সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এবং সকলের অংশগ্রহণকে সুনিশ্চিত করতে পারেনি৷ ল্যানডেস বলেছেন, যদিও সন্তান প্রতিপালন এবং গার্হস্থ্য জীবনের কিছু ক্ষেত্রে নারীরা ক্ষমতা ভোগ করে, কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে গৃহেও চূড়ান্ত কতৃত্ব থেকেছে ও থাকে পুরুষের হাতে৷
মিলারই সর্বপ্রথম তাত্বিক যিনি এই মত প্রকাশ করেন, ক্ষমতাশালী অনুভব করার অর্থ এই নয় যে, ক্ষমতাকে এই ধরণের সাবেকি পুরুষোচিত প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণমুখী মডেলের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে৷ মিলার বলেছেন- " we women have been most comfortable using our powers if we believe we are using them in the service of others." একই ভাবে এভিস ক্ষমতায়নকে ব্যাখ্যা করেছেন এই ভাবে - ক্ষমতায়ন হল একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে নারীদের সামর্থ্য ও যুক্তিবোধের প্রতি উচ্চমাত্রায় সন্মান বজায় রেখে নারী শোষণের কারণগুলো ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা এবং ব্যাক্তি, পরিবার ও বৃহত্তর ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তনকে সূচিত করা৷
ডারলিংটন ও ম্যুলভেনি ক্ষমতায়নের একটি বিকল্প মডেল উপস্থাপিত করেছেন, যাকে তাঁরা 'পারস্পরিক ক্ষমতায়ন'(Reciprocal Empowerment) বলে অভিহিত করেছেন৷ 'পারস্পরিক ক্ষমতায়ন' বলতে বোঝায়, প্রভাব সম্পর্কে একটি সার্বজনীন আদান-প্রদান মূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা৷ 'পারস্পরিক ক্ষমতায়ন' হল কাঠামো বা ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মঙ্গলসাধন, যে ব্যবস্থায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলো সাধারণ কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারে- 'আত্ম' ও 'অনাত্ম' - র মধ্যে বিভাজন ছাড়াই৷
পশ্চিমী প্রেক্ষাপটের বাইরে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রেক্ষাপটে নারী ক্ষমতায়নকে ব্যাখ্যা করেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন রেখা দত্ত এবং জুডিথ কর্নবার্গ৷ তারা বলেছেন যে, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নারী তাঁর ক্ষমতা সমুক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে৷ তাই নারী সক্রিয়তা ও তৃণমূল স্তরের আন্দোলনের মধ্যেই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে৷ তাঁরা দেখিয়েছেন, নারী যখন নিজেদের সংঅগঠিত ও সচল করে তোলে এবং নেতৃত্ব প্রদানের জায়গায় চলে আসে তখনই সে ক্ষমতাশালী হয়৷ এছাড়া সংগীতা পুরুষথামন দেখিয়েছেন যে, আন্তঃপরিবারিক এবং আন্তঃগোষ্ঠীগত ক্ষেত্রে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বর্ধিত মাত্রা এবং সম্পদের উপর অধিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত৷ একটি স্থির আয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক স্বাধীনতা নারীদের ক্ষমতায়িত করে তোলে৷ সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মহিলারা সঞ্চয় ভান্ডার প্রতিষ্ঠাকরে মহাজনদের ঋণের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে৷ শুধু তাই নয় উপকরণের বাজারে দর কষাকষির ক্ষেত্রেও মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷
এই বিভিন্ন তাত্ত্বিক অবস্থানগুলি থেকে নারী ক্ষমতায়নের প্রকৃত স্বরূপটি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা য়ায়৷ তবে কোন একটি তত্ত্বকে সার্বজনীন ভাবে প্রয়োগ করা যায় না৷ দেশ কাল পরিস্থিতি ভেদে ক্ষমতায়নের পৃথক কৌশল ও নীতি অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন৷ তবে এই তাত্ত্বিক অবস্থান গুলি সাহায্য করে নারী ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিকগুলিকে উন্মোচিত করতে এবং সম্ভাব্য বিকল্প তত্ত্বগুলির মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে ক্ষমতায়ন সঠিক কৌশলকে যথাযতভাবে করতে এজন্য নারী ক্ষমতায়নের বিভিন্ন তাত্ত্বিক চর্চার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি৷
|