মুখ্য পৃষ্ঠা > অন্যান্য বিষয় > ওয়েবদুনিয়ার বিশেষতা 08 > মহিলা দিবস
পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়ামিত্রকে পাঠানএই পৃষ্ঠা প্রিন্ট করুন
 
উত্তর আধুনিক নারীবাদ

ডঃ প্রদীপ বসু

নারীর উপর পুরুষের প্রভুত্ব, অসাম্য, পিতৃতন্ত্র, নারীর আর্থিক নির্ভরতা, যৌন পীড়ন, চিন্তনে-সংস্কৃতিতে নারীকে নিকৃষ্ট গণ্য করা - এসবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারার নারীবাদীরা নারী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন৷

আঠারো শতকের ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট প্রভাবিত উদার নারীবাদ(মেরি উইস্টোনক্রাফট) চায় রাষ্ট্রীয় আইনের সংস্কার - বাইরের জগতে, প্রতিষ্ঠানে, কর্মে, শিক্ষায় ব্যাক্তি হিসেবে নারীর সমানাধিকার৷আগে ভাবা হত নারী-পুরুষ বিভেদের মূল জৈবিক পার্থক্য সক্রিয়(লিঙ্গ বা সেক্স ভিত্তিক বিভাজন)৷ কিন্তু ক্রমশ এল 'সামাজিক লিঙ্গ'(জেন্ডার) ধারণাটি৷ বলা হল, 'নারী', 'পুরুষ' এধারণাগুলো নিছক জৈবিক বিভাজন নয়৷ বরং সমাজের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ার সব কিছু মিলিয়ে কেউ নিজেকে 'নারী' বা 'পুরুষ' ভাবেন৷ স্থির হয় তাঁর সামাজিক ভূমিকা - "ওয়ান ইজ নট এ ওম্যান, বাট বিকামস এ ওম্যান"(সিমোন দ্য বোভোয়া)৷

1970 সালে রাডিক্যাল নারীবাদীরা(কেট মিলেট) বললেন, জেন্ডার বিভাজনই সমাজের মূল বিভাজন৷ সব সমাজই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় রচিত৷ তাই দেশ,কাল,শ্রেনী,জাতি,বর্ণ নির্বিশেষে সব নারী একই গোষ্ঠীভুক্ত৷ এঙ্গেলস অনুপ্রাণিত দুটি ধারাঃ(1) মার্কসবাদী নারীবাদী(ক্লারা জেটকিনস)মতে, নারী শোষণের জন্য পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই মূলত দায়ী৷ সমাজতন্ত্রেই এর সমাধান৷ (2) সমাজতন্ত্রী নারীবাদী(অ্যান হুনলার) মতে, মার্কসবাদ শ্রেণী ভিত্তিক ব্যাখ্যার ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দেয়৷ কিন্তু পিতৃতন্ত্র,যৌনতা, লিঙ্গভেদ, জেন্ডার, মনস্তত্ত্বও বিবেচ্য৷

উত্তর আধুনিক নারীবাদ(ক্রিস্তেভা,সিকসু) এ ধরণের সার্বিক ব্যাখ্যার বিরোধী৷ এঁরা দেখানঃ (1) এনলাইটেনমেন্ট অনুপ্রাণিত পশ্চিমী আধুনিকতা কীভাবে সব মানুষের, অতএব, সব নারীর মুক্তি ও প্রগতির স্বপ্ন দেখালেও তা আসলে অদৃশ্য ক্ষমতার তন্ত্রজালের ওপর দাঁড়িয়ে৷ (2) নিজের জ্ঞান অর্থাত শ্বেতকায় পুরুষের জ্ঞানকে সে বিশ্বজনীন মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে৷ অতএব, নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য৷ একমাত্র যথার্থ বৈজ্ঞানিক সত্য বলে দাবি করে ও অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়৷
(3) কীভাবে সব একই গোষ্ঠীভুক্ত ভাবলে, কৃষ্ণাঙ্গ নারী, তৃতীয় বিশ্বের নারী, যৌণকর্মী,গ্রামীণ নারী, উপজাতীয় নারী, সমকামী নারী সকলের ওপর মূলধারার শ্বেতকায় নারীর প্রভুত্ব ও আধিপত্য(hegemony)-কে চাপিয়ে দেওয়া হয়৷ (4) 'ভাষা' কীভাবে পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতার সঙ্গে মিলে যায় এবং পুরুষকেন্দ্রীক বাস্তবতা নির্মাণ করে৷(5) কীভাবে আধুনিক জ্ঞান ও ক্ষমতা, বিবিধ প্রতিষ্ঠান ও প্রাধান্যকারী চিন্তা-ভাবনা(discourse) 'নারী' বা 'পুরুষ' নামক আত্মপরিচিতি(identity) গড়ে তোলে৷ (6) অর্থাত কেন 'নারী' বা 'পুরুষ' পরস্পর বর্জিত বিপরীত(binary) দুটি ধারণা নয়৷ বরং একদিকে জৈবিক লিঙ্গ বা সেক্স, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক জেন্ডার - এদুয়ের মাঝখানে বিভিন্ন বিন্দুতে বিভিন্ন মানুষের অবস্থান৷(7) কিভাবে একই ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে থাকে বহু সত্তা, বিভিন্ন প্রেক্ষিতে একেকটি প্রবল হয়ে ওঠে৷(8) কেন তাই 'নারী' বা 'পুরুষ' সত্তা পূর্বপ্রদত্ত, প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ নয়৷

বরং রাজনৈতিক আকাংক্ষার দ্বারা চালিত হয়ে, বিশেষ প্রেক্ষিতে নৈতিক-রাজনৈতিক রণনীতির সাহায্যে গড়ে তুলতে হবে নারী সত্তা, নারীবাদী ঐক্য ও সংগ্রাম৷


লেখক স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপ
অতিরিক্ত
কর্মক্ষেত্রের সমস্যাঃ একটি বাস্তব চিত্র
এক সত্যি ঘটনা
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের অবস্থান
এখনো এগোতে হবে অনেকটা পথ
নারীর ক্ষমতায়নঃ তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট
দরকার আরও বেশী শিক্ষা