বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে আবদুর রউফের নাম কারুরই অজানা নয়৷ তিনি একাধারে চিন্তাবিদ, সমাজ সচেতক৷সমাজে নারী স্বাধীনতা ও প্রসার নিয়েও তিনি সচেতন৷ নারী স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য থাববেই৷ সেই বক্তব্যই তিনি তুলে ধরলেন বাংলা ভাষার প্রথম নিউজ পোর্টাল বাংলা ওয়েবদুনিয়ার সাংবাদিক প্লুটাস কর্মকারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে৷
প্রশ্নঃ স্বাধীনতার 60 বছর পর সময় অনেকটা বদলেছে৷ এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতীয় মহিলাদের কতটা উন্নতি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ স্বাধীনতার পর বহু সময় অতিক্রান্ত হয়েছে৷ অনেকটা সময় আমরা পেরিয়ে এসেছি৷ সে দিক থেকে দেখতে গেলে মহিলাদের উন্নতি হয়েছে৷ অনেকটাই হয়েছে৷ আগের থেকে শিক্ষার হার বেড়েছে৷ পুরানো ধ্যান ধারণা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে৷ পরিবর্তন হয়েছে মানসিকতার৷ মহিলারা এখন অনেক বেশী করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করছেন৷ এসব দিক বিচার করলে বলাই যায়, মহিলাদের খুবই উন্নতি হয়েছে৷
প্রশ্নঃ মহিলাদের এই উন্নতির মাত্রা কি পুরুষদের তুলনায় কি বেশী মনে হচ্ছে?
উত্তরঃ না, ভারতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের উন্নতি তুলনা করলে হতাশই হতে হবে৷ কেননা সেক্ষেত্রে মহিলাদের উন্নতির হার খুব একটা ভালো নয়৷ পুরুষদের হারের সঙ্গে তুলনা করলে৷ কেননা আমাদের সমাজ এখনও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ৷ আর এই সমাজে বেশ কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে৷আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো হলেও তার চেতনা খুব একটা বিকশিত হয়নি৷ বা মূল ধারার সঙ্গে একাত্ত হয়ে ওঠেনি৷ শহর ও গ্রামের পরিকাঠামো গত পার্থক্য রয়েছে৷ গ্রামের সমাজ এখনও পুরুষতান্ত্রিক৷ মহিলারা বহু ক্ষেত্রেই পুরুষদের উপর নির্ভরশীল৷ শহরেও অনেকটা একই ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়৷ শহুরে চাকুরীজীবী মহিলারাও পুরুষদের উপর নির্ভরশীল৷ অনেকে অবশ্য নিজে ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন৷ কিন্তু বেশীর ভাগ মহিলা যারা শিক্ষিতা তারাও পুরুষদের উপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করেন৷ সে দিক থেকে নারী-পুরুষদের সম্পর্কের পরিবর্তন খুবই কম৷
প্রশ্নঃ ভারতের আজও মহিলারা অত্যাচারিত৷ কিন্তু নারী সুরক্ষা বা অধিকার রক্ষা নিয়ে আলোচনা, বক্তৃতাও কম হচ্ছে না৷ আপনার কি মনে হয় কাজের কাজ না করে এসব আলোচনার কোন দরকার আছে৷
উত্তরঃ দেখুন, আমরা গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করি৷ গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বৈশিষ্ঠ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং তর্ক৷ এই আলোচনা এবং তর্ক হওয়া ভাল৷ কেননা কথা হচ্ছে বলেই কাজ হচ্ছে৷ ঠিক তেমনি মহিলাদের সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে নানা জায়গায় অনেক আলোচনা হচ্ছে৷ আর তার থেকেই বেরিয়ে আসছে কিছু করার মানসিকতা৷ বধূ নির্যাতন নিয়ে আইন হয়েছে৷ আর এই আইন বলে মহিলারা অন্যায়ের প্রতিকার পাচ্ছেন৷ কিন্তু এর উল্টো বিপত্তিও রয়েছে৷অনেকেই এই আইনের অসদ ব্যবহার করছে৷ দুষ্টু বধূরা থানায় গিয়ে শ্বশুর বাড়ির নামে মিথ্যে অভিযোগ জানিয়ে আসলে হাতকড়া পড়ছে বেচারা শ্বশুর বাড়ির লোকেদের হাতে৷ কিন্তু একথাও সত্যি নারীরা আজও মার খাচ্ছে৷ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৷ সে দিক থেকে দেখতে গেলে নারী সুরক্ষার বিষয়টি আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার৷
প্রশ্নঃ মুসলমান মহিলাদের মধ্যে এখনও শিক্ষার হার অনেকটা কম৷ এনিয়ে আপনার মতামত কি৷
উত্তরঃ মুসলমান মহিলারা এখন শিক্ষা চায়৷ তারা লেখাপড়া শিখতে আগ্রহী৷ অনেকক্ষেত্রে পুরুষদের থেকেও তারা বেশী আগ্রহী৷ কিন্তু এক্ষেত্রে একটা সমস্যা রয়েছে৷ আপনি যদি সাচার কমিটি ভালো করে পড়েন, তাহলে দেখবেন সেখানে একটা কথা বলা হয়েছে৷ যে সব এলাকায়(মুসলমান অধ্যুষিত) স্কুল বাড়ির কাছাকাছি সেখানে মুসলমান মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে৷ কিন্তু দূরে হলে তারা স্কুলে যেতে চান না৷ এক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি ভীষণ ভাবে জড়িত৷ এই সব ছাত্রীরা স্কুল ছুট হয়ে পড়লে মাদ্রাসায় ভর্তি হন৷ কারণ মাদ্রাসাগুলো তাদের বাড়ির কাছে হয় বলে৷ এই বিষয়ে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে মাদ্রাসাগুলো মুসলমান পাড়ার কাছে হওয়ার জন্য সেখানে বহু সংখ্যায় মুসলমান ছাত্রী মাদ্রাসায় ভর্তি হন৷ এই মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যাবে ছাত্রী সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় অনেক বেশী৷ কিন্তু এটাও মানতে হবে মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার মান খুবই কম৷ তাই আগে মুসলমানদের বাড়ির কাছে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা উচিত৷কেননা যে মুসলিম মেয়েটি আজকে হাইস্কুল পাশ করে কলকাতায় যদি পড়তেও আসে তাহলে দেখা যাচ্ছে সেই মেয়েটির থাকার সমস্যা হচ্ছে৷ কলকাতায় মহিলা হোস্টেলগুলোতে আসন সংখ্যা মেরেকেটে 100টি৷ কিন্তু আবেদন জমা পড়ে 1000টির মতন৷ সেই ক্ষেত্রে সেই মেয়েটিকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে৷ তাই সবার আগে মুসলমান মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সুযোগ দেওয়া হোক৷
প্রশ্নঃ এরসঙ্গেই আপনাকে আরেকটি প্রশ্ন করি৷ বলা হয় মুসলমান নারীরা আজও পর্দার আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন৷ একথা কি সত্যি?
উত্তরঃ পর্দার আড়ালে থাকতে ভালোবাসে এ বিষয়টা সত্যি নয়৷আসলে এখন আবার পুরানো একটা ট্রেন্ড আসছে৷ অত্যধিক মাত্রায় ন্যাকেডিটি নিয়ে আলোচনা হবার পর, পর্দার ব্যাপারটা ফিরে আসছে৷ এপ্রসঙ্গে অনেক পশ্চিমী মহিলাদেরও বক্তব্য এই রকম যে পর্দা প্রথা কিছুটা হলেও ভাল৷ এপ্রসঙ্গে একটা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে৷ তাহল এক্সপোজ থাকলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে৷ তাই পর্দা প্রথার বিষয়টি কোন সমস্যা নয়৷ পশ্চিমবঙ্গে তো কোনো সমস্যা নয়ই৷আর ইসলামের বোরখা পড়বার পিছনে একটা ছোটো একটা প্রসঙ্গ জড়িত রয়েছে৷ এই বোরখা প্রথাটা এসেছে আরব থেকে৷ আরবে ভীষণ গরম, ধূলো উড়ে৷ সেই লু থেকে বাঁচার জন্যই বোরখার উত্পত্তি৷ কিন্তু মুসলমানরা এরপর যেখানেই গেছে বোরখাও সঙ্গে গেছে৷ কিন্তু এটা খারাপ কিছু নয়৷ ইমরানের প্রাক্তণ স্ত্রী জেমাইমাকেও এই প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, উনি কিভাবে বোরখাকে মানিয়ে নিয়েছেন৷ তিনিও জানিয়েছিলেন তাঁর অসুবিধা হবে না৷
প্রশ্নঃ বর্তমানে যেভাবে নারী পাচার হচ্ছে তার প্রতিকার করা যায় কিভাবে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ নারী পাচার এত বেড়েছে তা সরকারী ব্যর্থতা৷ আপনি যদি এবিষয়ে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন তাহলে দেখবেন, যে সব এলাকা থেকে নারী পাচার হয় তা খুবই দরিদ্র এলাকা৷ এই সব পরিবারও খুবই দরিদ্র৷ এরা নিজের ঘরে গলগ্রহ হয়ে থাকে৷ পরিবারেও ধারণা হয় মেয়েটা রোজগারে লাগছে না৷ তাই সে অবাঞ্ছিত৷ আর এসব এলাকালেই বেশী করে হিউম্যান ট্রাফিকিং হয়৷ আর সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় এই নারী পাচারের কাজ বেশী হয়৷ আর এই সমস্যা পীড়িত এলাকা বলেই৷ যেখানে রোজগার নেই৷ আর এই সব হতভাগ্য মেয়েরাই আড়কাঠি পাল্লায় পড়ে৷ এই সমস্যা মিটতে পারে জীবিকার সুযোগ তৈরী করলে৷ গ্রামে 100 দিনের কাজ দেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু তাতও দেওয়া হচ্ছে পুরুষদের৷ আর এতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে সমস্যা৷
|