'কলকাতা পুস্তকমেলা' কলকাতা তথা বাঙালীর গর্বের বিষয়৷ সেই সত্তরের দশক থেকে তার যাত্রা শুরু৷ কিন্তু নিউ মিলেনিয়ামে এসেই কোথায় যেন বইমেলার পথে ছড়িয়ে পড়ল ভাঙা কাঁচ, আর কাঁটা৷ সঙ্গে বাড়তি পাওনা আইনি বাধা বিপত্তি এবং জটিলতা৷ আর 2008 সালে তো বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম পার্বণ বইমেলা হবে কিনা তা নিয়ে দেখা গেল ঘোর সংশয়৷ বইমেলার এই ইতিহাস ও নতুন লড়াই নিয়ে বাংলা খবরের দুনিয়ার সর্বপ্রথম বাংলা নিউজ পোর্টাল 'বাংলা ওয়েবদুনিয়ার' জন্য কলম ধরেছেন পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্সের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়৷
বইমেলা প্রথম শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে৷ 1923 সালে ইংল্যান্ডে খুবই ক্ষুদ্র আকারে৷ বৃহত আকারে বইকে নিয়ে মানুষের কাছে প্রদর্শন ও সরাসরি বিক্রিজাত এবং দেশ বিদেশের প্রকাশকদের অংশগ্রহণ- এই উদ্যোগ প্রথম শুরু হল 1944 সালে৷ জার্মানির লিপজিগ বইমেলা৷ ভারতবর্ষে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়ার উদ্যোগে দিল্লিতে 1975 সালে প্রথম দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক "বিশ্ব বইমেলা" বা World book fair- আয়োজন করা হয়৷
1976 সালে আরাম্ভ হল পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড আয়োজিত "কলকাতা পুস্তকমেলা"৷ মাত্র 8 বছরের মধ্যে সারা পৃথিবীর কাছে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে "কলকাতা পুস্তকমেলা" আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করে 1983 সালে৷ এরপরের ইতিহাস কলকাতা পুস্তকমেলার অগ্রগতির ইতিহাস৷ এই শতাব্দীতে ত্রাস এই বইমেলা অর্জন করল, 'পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠক ধন্য বইমেলা'র বিরল সম্মান৷
কিন্তু বিপদ ঘনিয়ে আসছিল নিঃশব্দে৷ কলকাতা বইমেলার এত জৌলুষ বোধহয় কিছু গোষ্ঠির জন্য হচ্ছিল না৷ অদূরদর্শিতা ছিল প্রশাসনিক স্তরেও৷ কারণ কলকাতা বইমেলার পক্ষথেকে বারেবারে চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন ময়দানের কোন জায়গাকে চিহ্ণিত করেননি " স্থায়ী বইমেলা প্রাঙ্গন হিসাবে৷'' এর সুযোগই নিল বিশেষ গোষ্ঠির মদতপুষ্ট সামান্য কতিপয় স্বঘোষিত পরিবেশ সংগ্রামী ও আইনজীবী৷
'ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল' নামক সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের জয়ের স্মারককে রক্ষা করার জন্য তাঁদের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না৷ তাজমহলের ক্ষুদ্র প্রতিরূপে এই সৌধ পরিবেশ দূষণে কালো হয়ে যাচ্ছে, এই জিগির তুলে জনস্বার্থ মামলা শুরু হল 2002 সালে 'কলকাতা হাই কোর্টে'৷ শেষ ফল পেল 'কলকাতা বইমেলা'৷ 2007 সালে শেষমুহূর্তের রায়ে ময়দান থেকে পরিবেশের ধুয়ো তুলে উদ্বাস্তু হল আমাদের গর্বের কলকাতা বইমেলা৷
আপাত্কালীন পরিস্তিতিতে বিদেশি প্রকাশক ও অতিথিদের কথা ভেবে গিল্ড মাত্র দশ দিনের মধ্যে অনেক ছোট আকারে আয়োজন করলেন কলকাতা পুস্তকমেলা 2007, সল্ট লেক স্টেডিয়ামে৷ 2008 সালের জন্য ময়দান ফিরে পাওয়ার লড়াই জারি রইল৷ রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকার সকলকে বারংবার অনুরোধ আবেদন করেও যখন ময়দানের অনুমতি মিলল না, তখন প্রশাসন পুরসভা সকলেই বললেন, 2008 কলকাতা বইমেলা হোক পার্ক সার্কাস ময়দানে৷ আশ্চর্য! কলকাতা বইমেলার শত্রুরা তখনও পিছু ছাড়ল না৷ ঠিক একই পদ্ধতিতে জনস্বার্থ মামলা বইমেলা শুরুর 8 দিন আগে৷ হাই কোর্ট রায় দিলেন, কলকাতা বইমেলা পার্ক সার্কাসে করা যাবে না৷ যাবতীয় যথাযত অনুমতি থাকা সত্ত্বেও৷
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে চলতে পারে না৷ যেখানেই হোক কলকাতা বইমেলা, এই অন্ধকারের জীবেরা সক্রিয় হবেই৷ সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও আইনি স্তরে লড়াই চালাব আমরা৷ শেষ দেখে ছাড়ব৷ ইতিমধ্যে ছোট ও মাঝারি প্রকাশকদের কথা ভেবে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হল বিকল্প বইমেলা করার৷ সল্টলেক স্টেডিয়ামে৷ দুর্ভাগ্য, সে মেলায় দাপিয়ে বেড়ালেন বৃহত্ প্রকাশরাই৷ 'বইমেলা 2008' নামের ওই বইমেলা হল 'কলকাতা পুস্তকমেলা'র অসম অনুকরণ৷ কলকাতা বইমেলা 2009- এর লড়াই আমরা জারি রেখেছি৷ তারই এক 'পদক্ষেপ বিশ্ব বই দিবস' ও 'বইবাজার'- এর বৃহত্ ও বর্ণাঢ্য আয়োজন৷
23শে এপ্রিল থেকে নন্দন-রবীন্দ্র সদন প্রাঙ্গনে শুরু হয়েছে 12তম বিশ্ব বই দিবস উদযাপন এবং বই বাজার৷ চলবে 4 মে পর্যন্ত৷ আমরা খুশি, ছোট ও মাঝারি প্রকাশকদের মুখে হাসি ফুটেছে৷ হাসি ফুটেছে বই পিসাসু মানুষের মুখেও, যাঁরা জলের দরে বই পাচ্ছেন৷ ও মাঝারি প্রকাশকদের মুখে হাসি ফুটেছে৷ হাসি ফুটেছে বইপিপাসু মানুষের মুখেও, যাঁরা জলের দরে বই পাচ্ছেন৷ আমাদের জয় এখানেই৷
এই খবর হিন্দিতে পড়ার জন্য ক্লিক করুক
|