ড: বিদিশা সিনহা
অপ্রমেয় সৃষ্টির অনন্য কারিগড় রবীন্দ্রনাথের ছিল একটা নির্মল হাস্যরসিক মন৷ রসিকতায় তিনি অপ্রমেয় হৃদয়ে যে অপার আনন্দ সৃষ্টি করতে পারতেন, তাঁর অজস্র সৃষ্টিও রয়েছে তাঁর লেখায় এবং আনন্দেরস্মৃতি কথায়৷ রসিকথা সম্পর্কে তাঁর নিজের মন্তব্য হল-"রসিকতা জিনিসটা বড় বিপদের জিনিস-ও যদি প্রসন্ন সহাস্য মুখে আপনি ধরা দিলে তো উত্তম, আর ওকে নিয়ে যদি টানাটানি করা যায়, তবে বড়োই ব্যাস্তস হবার সম্ভবনা৷ হাস্যরস প্রাচীনকালের ব্রক্ষ্মামন্ত্রের মতো৷ যে ওর প্রয়োগ জানে সে তাকে নিয়ে একেনিয়ে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিতে পারে৷ আর যে হতভাগ্য ছুঁড়তে জানে না অথচ হাসতে যায় তার বেলায় 'বিমুখ ব্রক্ষ্মাস্ত্র আসি অস্ত্রীকেই বধে'৷ হাস্যরস তাকেই হাস্যকর কোরে তোলে৷" তিনি কৌতুক হাস্যের কারন ও মাত্রা নির্দেশ করেছেন তাঁর একটি গ্রন্থে৷ ছিঠিপত্রেও চাপা কৌতুকের হাজারো নির্দেশ রেখেছেন৷
নিজের কোমরে বাতের ব্যথা সংক্রান্ত দুর্দশা নিয়ে লিখেছেন- "বিরহের চেয়ে কোমরের বাতটি বেশি গুরুতর বোধ হচ্ছে৷ কবিরা যাই বলুন আমি এবার টের পেয়েছি বাতের কাছে বিরহ লাগে না৷ অথচ কালিদাস থেকে রাজকৃষ্ণ রায় পর্যন্ত কেউই বাতের উপর একছত্র কবিতা লেখেননি৷" এ প্রসঙ্গে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রসঙ্গ এনে সুন্দর রসিকতা করে লিখেছিলেন-" আপনি কেতাবে পড়ছেন কিন্তু বস্তুত জ্ঞানে যে জননী বসুন্ধরা ক্রমাগতই আমাদের মধ্যদেশ ধরে আকর্ষণ করেছেন, বাত হলেই তবে তাঁর সেই মাতৃস্নেহের প্রবল টান সবিশেষ অনুভব করা যায়৷" দূর যাত্রার সময়ে বাক্স-বিছানা নিয়ে তিনি কি ঝামেলায় পড়েছেন,- ভ্রমনের সময়ে বাক্সো-টানাটানি যে সুস্থ মানুষকে কতটা অসুস্থ করে তুলতে পারে, সেসম্পর্কে দার্জিলিং যাত্রাকালীন বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, "এই দুদিনে আমি এত বাক্স খুলেছি এবং বন্ধ করেছি..... এত বাক্স পাঁটুলির পিচনে আমি ফিরেছি...... কোন ছাব্বিস বত্সরের বত্সরের ভদ্রসন্তানের অদৃষ্ট এমনটা কাটেনি আমার ঠিক বাক্স ফোবিয়া হয়েছে, বাক্স দেখলে আমার দাঁতে দাঁত লাগে৷" এই হাসির উত্স হৃদয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রন মসিস্কের৷ এর মাত্রা এমনই যে অট্টহাসিতে হাহাকরে হেটে পড়তে হয় না, অথচ স্ফিত হাস্যে ওষ্ঠ ভরিয়া তোলে৷
বোলপুরে একদিন সন্ধে বেলায় দুই বন্ধুকে নিয়ে মাইল খানেক দূরে বেড়াতে গিয়ে প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টিতে একেবারে নাজেহাল হয়ে বাড়িফিরে লিখলেন- "বৈষ্ণব কবিরা গভীর রাত্রে ঝড়ের সময় রাধিকার অকাতর সম্বন্ধে অনেক ভালো ভালো মিষ্টি কবিতা লিখেছেনে, কিন্তু একটা কথা ভাবেননি এরকম ঝড়ো কৃষ্ণের কাছে কি তিনি মূর্তি নিয়ে উপস্থিত হতেন৷ চুলগুলোর অবস্থা যে কিরকম হতো সেতো বেশ তোরা বুঝতে পারবি৷" এ হাসি ক্ষণিক নয়, ভুলে যাওয়ার নয়৷ এই ভাবে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও স্রষ্ঠা রবীন্দ্রনাথ যে বীক্ষণে হাসির বলয়ে স্ক্রু মুক্ত তার সঙ্গে পাঠকও একাত্মা হয়ে যায়৷ রবীন্দ্রনাথ এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যাকে কোনদিন ভেবে চিন্তে রসিকতা করতে হয় নি৷
এরকম রসিকতায় কাউকে বিদ্রুপ করার কোন উদ্দেশ্য নেই, নির্মল আনন্দদান-ই এর প্রবনতা৷ পাঠক বা স্রোতার বৌদ্ধিক চেতনায় অনুরণন জাগিয়ে রবীন্দ্রনাথ হাস্যরসের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন৷ সহজ, সতঃস্ফুর্তভাবে তাঁর মুখের কথায় বা লেখায় এইসব এসে যেত৷ 'হালবাংলার সিদ্ধিদাতা গনেশ' রবীন্দ্রনাথের এই হাস্যরসিক সিদ্ধিও আমাদের তাঁর সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে অণুপ্রাণীত করে৷
লেখিকা স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপিকা
|