ভগবান মহাদেব, তার পুত্র গণেশ ও পার্বতীকে একটি গুহায় অমরকথা শুনিয়েছিলেন বলে সেই থেকে গুহার নাম হয়েছে অমরনাথ গুহা৷ এখানে তিনটি বড় বড় বরফের লিঙ্গ হয়, তার মধ্যে যেটা সবথেকে বড়, সেটি মহাদেব৷ তার পাশে পার্বতী ও তার পাশে গণেশ৷ সবথেকে আর্শ্চয্যের ব্যাপার যেটা অতবড় গুহায় কোনো ছিদ্র নেই, তাহলে কী ভাবে তৈরি হয় বরফ লিঙ্গ? কথিত আছে যে ভগবান মহাদেব যখন পার্বতীকে অমরকথা শোনাচ্ছিলেন, সেই সময় দুটি পায়রা সেই কথা শুনে ফেলার জন্য তারাও অমর হয়ে যায় এবং তারাও ওখানেই থাকে৷যেটা আর্শ্চয্যের ব্যাপার অত ঠান্ডায় যেখানে অন্য কোনো পাখির অস্তিত্ব নেই, সেখানে দুটি পায়রা অত ঠান্ডায় বছরের পর বছর ওখানে থাকে কেমন করে? এত দুর্গম পথে কিসের টানে লাখ লাখ মানুষ যায় সেটা কি শুধুই adventure? নাকি সত্যিই ভগবানের টান? মনের মধ্যে এতগুলো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য ঠিক করলাম এবার অমরনাথ যাব৷ যেমন ভাবনা তেমন কাজ৷ রওনা হলাম অমরনাথের পথে৷
হাওড়া স্টেশন থেকে হিমগিরি এক্সপ্রেস ছাড়ে রাত 11.45 মিনিটে৷ সেটা পরের পরের দিন বেলা 2.30 টায় জন্মু স্টেশনে আসে৷ জঙ্গী কারণের জন্য জন্মু থেকে মোবাইল কাজ করে না৷ স্টেশনের পাশে অনেক খাওয়ার হোটেল আছে৷ সেখানে মিল প্র্রথায় খাওয়ার ব্যবস্থা আছে৷ গেলামরঘুনাথ মন্দিরে, যেখানে কিছুদিন আগে জঙ্গী হামলা হয়েছিল৷ রঘুনাথ মন্দিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই ঘটনা হবার পর থেকে খুবই কড়া৷ কোনোকিছু সঙ্গে (টাকা বাদ) নিয়ে যাওয়া যায় না৷ খুবই সুন্দর ও সাজানো মন্দির৷ মন্দির দেখে জন্মু স্টেডিয়াম কারণ ওখান থেকে অমরনাথের বাস ছাড়ে৷ ওখানে তিনরকম যেমন সাধারন, মিনি ডিল্যাক্স ও সুপার ডিল্যাক্স বাস আছে৷ প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ভাড়া৷ ওখান থেকে দুদিকে বাস যায়৷ একটা বালতালের পথে ও অন্যটা পহেলগাঁওয়ের পথ৷
পহেলগাঁওয়ের বাসের টিকিট কেটে আমরা ওখানে চাদর বিছিয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিলাম কারণ ভোর 4টায় বাস ছাড়ে৷ বাসের সামনে পিছনে অত্যন্ত কড়া পাহাড়া৷ বাস পাহাড়ী পথে চলছে আর আমরা অতি সুন্দর নৈসর্গিক শোভা দেখছি৷ প্রায় 11টার সময় জহওর টানেলের এখানে পৌঁছাল৷ এই টানেলটা জন্মু ও কাশ্মীরের মধ্যে প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাখুবই কঠোর৷ জঙ্গীরা অনেকবার চেষ্টা করেছে এই টানেলটাকে ধ্বংস করে দেওয়ার৷ এখানে ছবি তোলা নিষেধ৷ এরপর আমাদের বাস প্রায় সন্ধ্যে 5টার সময় পহেলগাঁও পৌঁছল৷ কাশ্মীরে রাত 8টার আগে রাত হয় না৷ পহেলগাঁওতে অমরনাথের বেসক্যাম্প হয়৷ মানে ওখান থেকে অমরনাথ গুহার উদ্দ্যেশে রওনা হয়৷ ওখানে আমাদের একপ্রস্থ চেক হওয়ার পর আমরা ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে গেলাম৷ ক্যাম্পে তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায়৷ আমাদের সময়ে 65টাকা মাথা পিছু ছিল যেহেতু আমরা চারজন ছিলাম তাই আমরা 100টাকায় একটা তাঁবু পেয়ে গেলাম৷ সেখানে যাবতীয় লাগেজ রেখে রাতে আমরা ভান্ডারাতে গেলাম খেতে৷ ওখানে বিনামুল্যে পেট ভরে খাবার পাওয়া যায়৷ সবধরনের খাবার এখানে আছে, কিন্তু নিরামিশ৷
পরদিন ভোর 6টার সময় আমরা সবাই উঠে পড়লাম৷ ওখান থেকে চন্দনবাড়ি পর্য্যন্ত সুমো করে নিলাম কারন ওইটুকু পথটা গাড়িতে যাওয়া যায়৷ সুমো ভাড়া 50টাকা জন প্রতি ৷ চন্দনবাড়ি থেকে পুরো এবার হাঁটা পথ৷ অবশ্য ঘোড়া, ডুলি পাওয়া যায়৷ আমরা যাত্রার জন্য প্রত্যেকে একটা করে লাঠি কিনলাম৷ কেননা যাত্রা পথে এটা খুব কাজে দেয়৷ এরপর আমাদের একপ্রস্থ চেক হওয়ার পর আমরা হাঁটা শুরু করলাম৷ প্রথমেই কিছুটা হাঁটার পর 1/2 কিমি পথ পুরো বরফের উপর দিয়ে হাঁটতে হবে৷ সেটা লাঠির সাহায্যে পার করার পর এল পিসু টপ৷ এটা খুবই খাঁড়া৷ কিন্তু ঘাবড়ানোর ব্যাপার নেই৷ কারন পাহাড় ধাপ কেটে কেটে সিঁড়ির রাস্তা বানানো হয়েছে৷ এতে ওঠার সময় খুব হাঁপ লাগে৷ তাই আস্তে আস্তে উঠতে হবে৷ তাড়াহুড়োর দরকার নেই৷ পিসু টপ পার হয়ে যাবার পর শেষনাগ পর্য্যন্ত রাস্তাটা কঠিন নয়৷ কখনও অল্প চড়াই আবার উতরাই আছে৷ শেষনাগে আবার থাকবার ক্যাম্প আছে৷ সেখানে ঢোকবার সময় আরেকপ্রস্থ চেক হবে৷ শেষনাগে থাকবার জায়গা আছে৷ ভান্ডারাদের বিনামুল্যে তাঁবুও যেমন আছে তেমন ভাড়া করা তাঁবু পাওয়া যায়৷ এখানে তাঁবুর রেট বেশি, 150টাকা জনপ্রতি৷ আমরা চারজন মিলে একটা তাঁবু নিলাম 300 টাকা দিয়ে৷ শেষনাগে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে৷ যারজন্য দুটো কম্বল দেওয়ার পরও আমরা সমস্ত গরমের জামা গায়ে জড়িয়ে নিলাম৷ পরেরদিন আমাদের গন্তব্য পঞ্চতরনী৷ শেষনাগ থেকে যার দুরত্ব প্রায় 14 কিমি৷
শেষনাগ নাম হওয়ার কারন ওখানে একটা বড় জলাশয় আছে৷ তাতে নাকি ভগবান শিব তার নাগকে ছেড়ে দিয়ে তবেই গুহার উদ্দ্যেশে গেছিলেন৷ কপাল খুব ভাল থাকলে তার দেখা পাওয়া যায়৷ আমরা অবশ্য তার দেখা পায় নি৷ পরের দিন হাঁটা শুরু করলাম পঞ্চতরনীর উদ্দ্যেশে৷ পথে এল মহাগুনাস টপ৷ এটা পিসু টপের মত নয় কিন্তু খুব উঠতে কষ্ট হয়৷ এরপর আমরা বিকাল 5টার সময় পৌঁছলাম পঞ্চতরনীতে৷ ঠিক করলাম এবার আমরা ভান্ডারাতে থাকব৷ এক নতুন অভিঞ্জতাও হবে৷ পঞ্চতরনী নাম হয়েছে তার কারন হল পাঁচটা নদী এখানে এসে মিশেছে৷ পরদিন আমাদের গন্তব্যস্থল অমরনাথ গুহা৷ এখান থেকে যার দুরত্ব প্রায় 9 কিমি৷ হাঁটা শুরু করলাম অমরনাথ গুহার উদ্দ্যেশে৷ গুহার ঠিক আগে প্রায় 3কিমি পথ শুধু বরফ আর বরফ৷ খুব পিচ্ছিল পথ৷ কিচুটা সামনে এগিয়ে আমাদের সামনে ধরা দিল বিশাল বড় গুহা৷ কিন্তু তাতে প্রচুর সিঁড়ি৷
প্রথমে আমরা পুজো দেওয়ার জন্য প্রসাদ কিনলাম৷ তারপর পাশেই অমরাবতী নদী বয়ে চলেছে৷ নদির জলে হাত পা ধুয়ে অমরলিঙ্গ দর্শন করলাম ও পুজো দিলাম৷ সামনে ছিল অজস্র মানুষের লাইন৷ খুবই দ্রুত গতিতে পুজো হচ্ছে৷ আমরা যখন সবাই উপরে পৌঁছালাম তখন মুগ্ধ হয়ে গেলাম৷ পাশাপাশি তিনটি বরফের লিঙ্গ৷ যেটা সবথেকে বড় সেটা ভগবান শিব, মাঝেরটা পার্বতী ও সবশেষে গনেশ৷ অজস্র মানুষ ধীরস্থির ভাবে পুজো দিচ্ছে৷ সবচেয়ে আশ্চর্য্যের ব্যাপার যে পায়রা দুটির ব্যাপারে শুনেছিলাম তারাও আছে৷ বিশ্বাস আর ভক্তিতে মন ভরে গেল ও সিদ্ধান্ত নিলাম আবার যদি কোনদিন সুযোগ আসে আবার আসব৷ ভগবানের ডাক না পেলে যে তার কাছে যাওয়া যায়, কথাটা ভীষন সত্যি৷ প্রমান পেলাম হাড়েহাড়ে৷ আমরা সবাই যখন পুজোর জন্য প্রসাদ কিনেছি তখনই এক বন্ধুর এতটাই শরীর খারাপ করল যে সে আর ঐটুকু পথ যেতে পারল না৷ যেটা স্বপ্নেও ভাবা যায় না৷
বাবা শিবকে সকলে মিলে ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে ওই একই পথে প্রচন্ড বৃষ্টির মধেই আমরা ফিরে এলাম চন্দন বাড়ি৷ সেখান থেকে পহেলগাঁও হয়ে সরাসরি জম্মু৷ অমরনাথ যাত্রার খরচ খুব বেশি নয়৷ মাথাপিছু কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা৷
অমরনাথ যাত্রা পথে যা যা লাগবে- 1) প্রথমে জন্মু কাশ্মীর ব্যাঙ্কের দেওয়া অমরনাথের পাস যোগাড় করতে হবে৷ যাত্রা পথে এই পাস অত্যন্ত প্রয়জনীয়৷ 2) পরিচয় পত্র অর্থাত ভোটার কার্ড সঙ্গে রাখবেন৷ 3) শুকনো খাবার সঙ্গে রাখবেন৷ 4) ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য সেই রকম গরমের জামা কাপড় রাখবেন৷ কেননা শেষনাগে ও পঞ্চতরনীতে খুব ঠান্ডা পড়ে৷ 5) ঠান্ডার ক্রীম, ছোটখাট রোগের ওষুধ, রোদ চশমা, টর্চ, ব্যাটারী, মোমবাতি, রেনকোট ইত্যাদি সঙ্গে নেবেন৷ পরিশেষে একটা কথা বলব যদি হেঁটে অমরনাথের যাত্রাপথের প্রকৃত আনন্দ নিতে চান তবে কমপক্ষে একমাস রোজ 2কিমি পথ হাঁটুন৷ তাহলে কষ্ট অনেক কম হবে৷ পায়ে হেঁটে যেতে না চাইলে হেলিকপ্টারে করে একেবারে গুহার সামনে নামুন ও পুজো দিন৷ বালতালের দিক দিয়ে যে পথ আছে সেখানে এই ব্যবস্থা আছে৷ জন্মু ও শ্র্রীনগর দুদিক থেকেই বালতালের বাস পাওয়া যায়৷ তা না হলে তো ঘোড়া বা ডুলি আছেই৷ অমরনাথের হাঁটা পথে কোন খাবার খরচ নেই৷
|