বারাণসী বাঙ্গালি তথা হিন্দুদের এক অত্যন্ত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র৷ বহু বছরের প্রাচীন শহর হল এই বেণারস৷ গঙ্গার এক পারে কাশী ও অপর পারে বারাণসী বা চলতি কথায় বেণারস৷ মনে করা হয় এখান থেকেই মানুষের স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে৷ জীনবের একটা অধ্যায় শেষ করে বহু মানুষ কাশী বাসী হতেন এক সময়ে৷ এই কাশীতেই লুকিয়ে আছে স্বর্গ লাভের মুল চাবিকাঠি৷
বারাণসী বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত৷ এই বারাণসী হল শিব আর পার্বতীর বাসস্থান৷ মনে করা হয় পার্বতী ও শিব হলেন বারাণসীর প্রথম অধীবাসী৷ শিবের জটা থেকে নেমে আসা গঙ্গা তীরেই গড়ে উঠেছে বারাণসী৷ তবে ঠিক কোন সময়ে বারাণসীর পত্তন ঘটে তা সঠিক ভাবে জানা যায় না৷ বহু বার এই বারাণসীর মন্দির শত্রুরা আক্রমন করে৷ প্রথম আক্রমন করেন 13শতাব্দীতে বখতীয়ার খলজী৷ এর পর মুঘলরাজ ঔরঙ্গজেব এই বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙ্গে এখানে একটি মসজিদ স্থাপন করেন৷ এখনো বিশ্বনাথ মন্দিরের দেওয়ালের সঙ্গে মসজিতের ভাঙ্গা অংশের নিদর্শন পাওয়া যায়৷ এর থেকে বলা যায় বর্তমান বিশ্বনাথ মন্দিরে হিন্দু, মুসলিম উভয় দেবতাই একসঙ্গে বাস করেন৷ এই মন্দিরে ভগবান শিবের একটি জ্যোতিরলিঙ্গ স্থাপিত আছে৷
1776 সাল থেকে 1780 সালে ইন্দোরের রানি অহল্যাবাঈ বিশ্বনাথ মন্দিরের পুনর্ণিমান করেন৷ এই মন্দিরের চূড়া দুটি সোনা দিয়ে বাঁধানো আছে৷ মন্দিরের চূড়া সোনা দিয়ে মুড়ে দেন পাঞ্জাব কেশরী রাজা রনজিত সিংহ 1839 সালে৷ তিনি প্রায় 800 -850 কেজি সোনা দান করেন মন্দিরের জন্য৷ মন্দিরের জ্যোতিরলিঙ্গ দর্শন করে পুজো দিলে জীবনের বহু পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়৷ মন্দিরের সামনে পবিত্র গঙ্গায় স্নান করলে বিগত দিনে করে আসা পাপ ধুয়ে যায় ও মনে শান্তি ফিরে আসে৷ তাই এই বেণারস এলে দেখতে পাওয়া যায় বহু পূরণার্থীর ও সাধু, সন্যাসীর৷ এই বেণারসে বাবা বিশ্বনাথের দর্শণ করেন অনেক মনিষীরাও, তাদের মধ্যে আদি শঙ্করাচার্য, শ্রী রামকৃষ্ণদেব, মা সারদামণি, স্বামী বিবেকানন্দ, তুলসিদাস, গুরু নানক, দয়ানন্দ সরস্বতী প্রমুখ৷ এই সব মনিষীরা তাঁদের আত্মিক শান্তি লাভের কারনেই এখানে এসেছিলেন৷ এক কথায় বলা যায় বেশ কয়েকটি যুগের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে বেণারস শহর ও বাবা বিশ্বনাথের মন্দির৷
মন্দিরের সামনে রাখা আছে বিশাল বড় দান পাত্র৷ এই দান পাত্রে বাবা বিশ্বনাথ বা মহাদেবকে সামর্থ অনুযায়ী অর্থ উত্সর্গ করলে মনবাসনা পূর্ণ হয়৷ এই জমা অর্থ থেকে মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষন করা হয়৷ বেণারসে মানুষেরা আসেন শিবের জটা থেকে নেমে আসা পবিত্র গঙ্গায় স্নান করে স্বর্গপ্রাপ্তি লাভের উদ্দেশে৷ পাপের বোঝা কম করতে অনেকে গঙ্গা ঘাট থেকে স্নান করে দন্ডি কেটে মন্দিরে প্রবেশ করেন৷ মন্দিরে প্রায় সারা দিন রাত ধরেই চলতে থাকে পুজো, আরতি৷
হিমালয় থেকে উত্পন্ন ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদী দেবপ্রয়াগের কাছে মিলিত হয়ে গঙ্গা নাম নিয়ে প্রথমে হরিদ্বারে প্রবেশ করে৷ হরিদ্বার থেকে যাত্রা শুরু করে গঙ্গা এলাহাবাদের এসে পৌঁচ্ছায়৷ এই এলাহাবাদে গঙ্গা মিলিত হয় যমুনা নদীর সঙ্গে৷ যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে গঙ্গা এসে পৌঁচ্ছায় বেণারসে৷ পরে গঙ্গা বহু নদ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে উত্সস্থল হিমালয় থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে তার যাত্রা শেষ করে৷ তার এই বিশাল যাত্রা পথে গঙ্গা কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু ধর্ম স্থান, মন্দির ও আরও কতো কী৷ এই মন্দিরের কাছেই আছে এক দূর্গা মন্দির৷ এখানে সংকোট মোচন মন্দির বিশেষ ভাবে বিখ্যাত৷ এই বেণারসে য নতুন বিশ্বনাথ মন্দির তৈরী হয় তার নাম বিড়লা মন্দির৷ সব মিলিয়ে বেণারসকে অত্যন্ত প্রবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসাবে গন্য করা হয়৷
|